
বিশ্ব প্রযুক্তি ও ব্যবসা জগতের অন্যতম আলোচিত নাম ইলন মাস্ক। বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা— প্রতিটি খাতেই নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন তিনি। তবে এবার তার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা শুধু প্রযুক্তি বিশ্ব নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতেই নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে মার্কিন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে স্পেসএক্স।
মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের নথি জমা দেওয়ার মাধ্যমে কোম্পানিটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেয়ারবাজারে প্রবেশের যাত্রা শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ওয়াল স্ট্রিটের ইতিহাসে অন্যতম বড় আইপিও হতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জুন মাস থেকেই নাসডাকে ‘SPCX’ নামে স্পেসএক্সের শেয়ার লেনদেন শুরু হবে।
এই আইপিওর মাধ্যমে স্পেসএক্স প্রায় ৪০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহ করতে চায়। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি থেকে ৯ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। কোম্পানিটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১০ লাখ কোটি টাকারও বেশি।
এই বিশাল মূল্যায়নের পেছনে মূল কারণ স্পেসএক্সের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া, স্টারশিপ মেগা রকেট তৈরি এবং ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপনের মতো প্রকল্পগুলো কোম্পানিটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো— এত বড় মূল্যায়নের পরও কোম্পানিটি এখনো লোকসানে রয়েছে। গত বছরে প্রায় ১৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করলেও স্পেসএক্সের নেট লোকসান হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেও আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বড় আকারেই রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাশ প্রযুক্তির মতো ব্যয়বহুল খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কারণেই এই ক্ষতি। কারণ একটি রকেট উৎক্ষেপণ, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরি কিংবা নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে এই বিনিয়োগই কোম্পানিকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
স্পেসএক্সের আইপিও ঘিরে আরেকটি বড় আলোচনা হচ্ছে ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ। বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। আইপিও সফল হলে তার সম্পদ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর সেটি হলে ইতিহাসের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ হিসেবে নাম লেখাবেন ইলন মাস্ক।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও পিছু ছাড়ছে না স্পেসএক্স ও মাস্ককে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ, ডিপফেক বিতর্ক এবং আইনি জটিলতার জন্য কোম্পানিটি শত শত কোটি ডলার সংরক্ষণের কথাও জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে স্পেসএক্সের আইপিও শুধু একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, মহাকাশ অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের নতুন ইঙ্গিত। এখন প্রশ্ন একটাই— ইলন মাস্ক কি সত্যিই মানবজাতিকে মহাকাশ যুগের নতুন অধ্যায়ে নিয়ে যেতে পারবেন, নাকি এই বিশাল স্বপ্ন একসময় বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে?