.
অর্থনীতি

অর্থনীতিকে গতিশীল ও দারিদ্র্যমুক্ত করতে স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার অপরিহার্য: রাজনৈতিক অঙ্গীকারের তাগিদ

Email :31

১০ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২৪শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৪ঠা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি রাত ২:০৯ মঙ্গলবার বসন্তকাল

দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করাতে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্যখাতকে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। বরং স্বাস্থ্যখাতকে উপেক্ষা করা হলে তা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের চ্যালেঞ্জকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা।

‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)’ এবং ‘ইউএইচসি ফোরাম’-এর যৌথ উদ্যোগে ‘প্রায়োরিটি হেলথ রিফর্ম অ্যাকশন এজেন্ডা: বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ’ শীর্ষক এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহযোগিতা করে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম।

‘প্রায়োরিটি হেলথ রিফর্ম অ্যাকশন এজেন্ডা: বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ’ শীর্ষক নীতিনির্ধারণী সংলাপ। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

সুস্থ কর্মশক্তিই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
সংলাপে মূল আলোচক হিসেবে পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ইউএইচসি ফোরামের আহ্বায়ক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুস্থ কর্মশক্তি। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমরা যদি স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার তালিকায় না রাখি, তবে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে। প্রতিবছর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অসংখ্য মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছে। করোনা মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা কীভাবে পুরো সমাজ ও অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে পারে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, দারিদ্র্য বিমোচন কেবল আয় বৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং মানুষকে স্বাস্থ্যজনিত আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করাও এর অন্যতম অংশ।

বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা
অনুষ্ঠানে ‘অ্যাডভান্সিং ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ: বাংলাদেশ হেলথ সেক্টর রিফর্ম রোডম্যাপ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএইচসি ফোরামের সদস্যসচিব ডা. মো. আমিনুল হাসান। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) সার্ভিস ইনডেক্সে বৈশ্বিক গড় যেখানে ৭১, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান মাত্র ৫৪।

ডা. আমিনুল হাসান বলেন, “২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই সূচক অন্তত ৮০-তে উন্নীত করতে হবে। যদি দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এখনই স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার শুরু করা যায়, তবে তা দেশের জিডিপি ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।” থাইল্যান্ডের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ধারাবাহিকতার কারণেই দেশটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও দলীয়করণের প্রভাব
সংলাপে অংশ নিয়ে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জাহিরুল ইসলাম শাকিল স্বাস্থ্যখাতের কাঠামোগত দুর্বলতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা মুখে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলি, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখনো ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ের অনেক মানুষ নূন্যতম সেবা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন গঠনের সুপারিশ থাকলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক।”

অন্যদিকে, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. এ কে এম ওয়ালিউল্লাহ পেশাজীবীদের ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যখাত সংস্কারে আমরা একে অপরের প্রতিপক্ষ নই। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, পেশাজীবী হিসেবে সবাইকে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে আইনি সংস্কার ও দলমত নির্বিশেষে সহযোগিতা প্রয়োজন।”

চিকিৎসার মান ও ভুল রোগ নির্ণয় নিয়ে উদ্বেগ
সংলাপে স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএনপির পরিবারকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মহসিন জিল্লুর করিম। তিনি বলেন, “দেশে ভুল চিকিৎসায় মানুষের মৃত্যু বা ভোগান্তির খবর উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এর মূল কারণ খুঁজতে হবে। এমন চিকিৎসক তৈরি করতে হবে যারা কেবল সনদধারী হবেন না, বরং নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে রোগীর সঙ্গে ন্যায়বিচার করবেন।” তিনি চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানান।

প্রতিরোধ ও সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো অতিমাত্রায় ‘হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রিক’ বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ উমর খৈয়াম। তিনি বলেন, শুধুমাত্র চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও পুনর্বাসন—এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ স্বাস্থ্যখাতকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকারের পরিবর্তন হলেও যেন স্বাস্থ্যনীতি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা অংশ নেন এবং উন্মুক্ত আলোচনায় নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts