১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৮:২৫ সোমবার বসন্তকাল
দীর্ঘদিন ধরে আরব দেশগুলোর মিত্র হিসেবে তাদের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে এসেছে পাকিস্তান। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের ভূমিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেবল প্রশিক্ষণ বা পরামর্শদাতা হিসেবেই নয়, পাকিস্তান এখন আরব বিশ্বে নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। সৌদি আরব, ইরাক, লিবিয়া থেকে শুরু করে আফ্রিকার সুদান পর্যন্ত—বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাকিস্তানের তৈরি যুদ্ধবিমান ও সমরাস্ত্র বিক্রির আলোচনা এখন তুঙ্গে।

সুদান ও লিবিয়ায় বড় অঙ্কের চুক্তির সম্ভাবনা
রয়টার্স ও অন্যান্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রায় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি অস্ত্র চুক্তি চূড়ান্ত করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে পাকিস্তান। বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারের তুলনায় এই অঙ্ক খুব বিশাল না হলেও, গত তিন বছর ধরে গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সুদানের জন্য এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র সরবরাহ করা হতে পারে, যা দেশটির সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে, লিবিয়ার বিদ্রোহী জেনারেল খলিফা হাফতারের বাহিনীর কাছেও পাকিস্তান তাদের গর্বের প্রতীক ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ যুদ্ধবিমান বিক্রির পরিকল্পনা করছে। গত ডিসেম্বরে হাফতারের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উত্তর আফ্রিকা ও আরব বিশ্বে পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি বাড়ানোর এটি একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
সৌদি আরব ও কৌশলগত প্রতিরক্ষা সমঝোতা
পাকিস্তানের এই অস্ত্র বাণিজ্যের কৌশলের মূল কেন্দ্রে রয়েছে সৌদি আরব। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদের সঙ্গে ইসলামাবাদের ‘কৌশলগত যৌথ প্রতিরক্ষা সমঝোতা’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির পর থেকেই সৌদি আরব পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইতিমধ্যে মিয়ানমার, নাইজেরিয়া ও আজারবাইজান পাকিস্তানের কাছ থেকে এই যুদ্ধবিমান কিনেছে। এছাড়া ইরাকও এই বিমান ক্রয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পণ্যের বৈচিত্র্য ও চীনের ভূমিকা
করাচিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কে-ট্রেড’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, পাকিস্তান কেবল যুদ্ধবিমানই নয়, বরং ট্যাংক, ড্রোন, সাঁজোয়া যান, নৌ-প্রযুক্তি এবং ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্রও বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে।
সৌদি আরবের কিং ফয়সাল সেন্টার ফর রিসার্চের সহযোগী ফেলো এবং সামরিক বিশ্লেষক উমর করিমের মতে, পাকিস্তানের অস্ত্র শিল্পের এই উত্থানের পেছনে চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। যেহেতু পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ও অনেক প্রযুক্তিতে চীনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা রয়েছে, তাই আরব দেশগুলো পাকিস্তানকে একটি ‘বিশ্বস্ত উৎস’ হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে যেসব দেশ পরাশক্তিগুলোর কাছ থেকে রাজনৈতিক কারণে অস্ত্র কিনতে বাধার সম্মুখীন হয়, তাদের জন্য পাকিস্তান একটি সহজ বিকল্প হয়ে উঠছে।
ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ ও সতর্কতা
পাকিস্তানের জন্য এই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনীতি। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, আরব বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
উদাহরণস্বরূপ, লিবিয়ায় খলিফা হাফতারের কাছে অস্ত্র বিক্রি বা সুদানের গৃহযুদ্ধে এক পক্ষকে সমর্থন দেওয়া পাকিস্তানের অন্য মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার আশায় পাকিস্তান যদি সতর্ক না হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ আরব মিত্রদের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, পাকিস্তান তার প্রতিরক্ষা শিল্পকে অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে। তবে আরব বিশ্বের এই পিচ্ছিল ভূ-রাজনৈতিক পথে তারা কতটা সফলভাবে হাঁটতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
Analysis | Habibur Rahman