৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ২:০৬ শুক্রবার গ্রীষ্মকাল
কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে নাটকীয় মোড় নিয়েছে নির্বাচনী সমীকরণ। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও সাবেক চারবারের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় আপাতত এই আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের কোনো প্রার্থী নেই। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফাঁকা মাঠে বড় ধরনের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ।
তবে রাজনীতির মাঠে শেষ কথা বলে কিছু নেই। নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে ছিটকে পড়লেও মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর সামনে এখনো ভোটের মাঠে ফেরার একটি সরু পথ খোলা রয়েছে। সেটি হলো উচ্চ আদালত।

মনোনয়ন বাতিলের প্রেক্ষাপট
তফসিল ঘোষণার পর কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রাথমিক বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ বলেও ঘোষিত হয়েছিল। কিন্তু এই বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে ইসিতে আপিল করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ ছিল, বিএনপি প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করেছেন। গত শনিবার নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানিতে হাসনাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মঞ্জুরুল আহসানের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে, মঞ্জুরুল আহসানও হাসনাত আবদুল্লাহর প্রার্থিতা বাতিলের জন্য পাল্টা আপিল করেছিলেন, কিন্তু ইসি তা নামঞ্জুর করায় হাসনাতের প্রার্থিতা বহাল রয়েছে।
ভোটের মাঠে ফেরার উপায় কী?
ইসি আপিল খারিজ করে দেওয়ায় প্রশাসনিকভাবে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর নির্বাচন কমিশনে আর কোনো করণীয় নেই। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
এমতাবস্থায় মঞ্জুরুল আহসানের সামনে এখন একমাত্র পথ খোলা রয়েছে— হাইকোর্টে রিট করা।
আইনজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উচ্চ আদালতে যেতে পারেন। অতীতে এমন নজির রয়েছে যেখানে ইসিতে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর প্রার্থীরা আদালতের রায়ে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ২০০৮ সালে মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী আদালতের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
তবে এই পথটি বেশ কণ্টকাকীর্ণ। মঞ্জুরুল আহসানকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, নির্বাচন কমিশন তাঁর প্রতি অবিচার করেছে অথবা এখতিয়ার-বহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঋণখেলাপি সংক্রান্ত জটিলতায় আদালতের রায় নিজের পক্ষে আনা বেশ সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালট পেপার ছাপানোর প্রক্রিয়া শুরুর আগেই মঞ্জুরুল আহসানকে আদালতের রায় নিয়ে আসতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, “মনোনয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে সাধারণত ইসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারেন। কিন্তু আদালতের রায়টি একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে হতে হবে। ব্যালট পেপার ছাপানোর পর তা পরিবর্তন করা ইসির জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।”
মঞ্জুরুলের আত্মবিশ্বাস ও প্রতিপক্ষের অবস্থান
আপিল হারলেও হাল ছাড়তে নারাজ মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। ইসির রায়ের পর ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় তিনি নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, “আল্লাহই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী।” তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, উচ্চ আদালত থেকে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং দ্রুতই আইনি লড়াই শুরু করবেন।
অন্যদিকে, ধানের শীষের প্রার্থী না থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এই আসনে বর্তমানে তিনি ছাড়াও ইনসানিয়াত বিপ্লব, খেলাফত মজলিস, গণঅধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে বিএনপিবিহীন মাঠে মূল লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে হাসনাত আবদুল্লাহর থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
শেষ কথা
আগামী ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এর মধ্যেই চূড়ান্ত হবে কুমিল্লা-৪ আসনে ধানের শীষ থাকবে কি না। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী কি আইনি লড়াইয়ে জিতে ব্যালটে নিজের নাম ফেরাতে পারবেন, নাকি হাসনাত আবদুল্লাহর পথ আরও মসৃণ হবে—সেটি দেখার জন্য দেবীদ্বারবাসীকে আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
Analysis | Habibur Rahman