৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:৫০ শুক্রবার গ্রীষ্মকাল
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে আন্দোলনের মাঠ না ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর ভাই শরিফ ওমর বিন হাদি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, রাজপথে জনগণের চাপ অব্যাহত না থাকলে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। একইসঙ্গে ভাইয়ের ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’ সম্পন্ন করতে দেশবাসীর প্রতি ওয়াদা চেয়েছেন তিনি।

আজ রোববার (২১ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক দোয়া ও আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম এই যোদ্ধার স্মরণে এবং তাঁর শাহাদাত উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করা হয়।
‘আর্থিক সাহায্য নয়, ইনসাফের বাংলাদেশ চাই’
শোকাতুর কণ্ঠে অথচ দৃঢ় প্রত্যয়ে শরিফ ওমর বিন হাদি বলেন, ‘ওসমান হাদিকে যারা ভালোবাসেন, যারা শাহবাগকে ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদমুক্ত দেখতে চান, তাদের এখনই থামলে চলবে না। আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমরা কোনো আর্থিক অনুদান বা করুণা চাই না। আমাদের একটাই চাওয়া, ওসমানের শুরু করা অসমাপ্ত বিপ্লব আপনারা সমাপ্ত করবেন। ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আপনারা শান্ত হবেন না।’
তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনের চাপ শিথিল হয়ে গেলে বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি উপস্থিত জনতা ও দেশবাসীর কাছে প্রতিজ্ঞা চান।
হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে ক্ষোভ
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনী প্রচারণার সময় অতর্কিত হামলার শিকার হন ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান ও আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে সরব মুখ ওসমান হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে দেশে ও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। টানা ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গতকাল শনিবার জাতীয় কবির সমাধির পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, প্রধান আসামিরা ভারতে পালিয়ে গেছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নাকের ডগা দিয়ে খুনিরা কীভাবে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ওমর বিন হাদি বলেন, ‘ওসমান হাদির মৃত্যুর পর আমাদের পুরো পরিবার এবং তার সহযোদ্ধারা এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। এক গভীর ট্রমার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি।’
রাজনৈতিক নেতাদের উদ্বেগ
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘রাজধানীর বুকে একজন প্রার্থীকে এভাবে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা প্রমাণ করে, ফ্যাসিবাদী শক্তি এখনো সক্রিয়। হাদি হত্যার ঘটনায় তিন শ আসনের প্রার্থীরাও আজ নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’
দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন এবং ঢাকা-১০ আসনের প্রার্থী জসীম উদ্দিন সরকার।
বক্তারা বলেন, ওসমান হাদি ছিলেন ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। তার এই আত্মত্যাগ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলনে তরুণ সমাজকে আরও উদ্বুদ্ধ করবে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এসময় মিলনায়তনে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
Analysis | Habibur Rahman