.
জাতীয়

চানখাঁরপুল হত্যাযজ্ঞের রায় নিয়ে ক্ষোভ: ট্রাইব্যুনাল রেজিস্ট্রারের কাছে শহীদ পরিবারের স্মারকলিপি ও পুনর্বিবেচনার দাবি

Email :44

৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:০৭ শুক্রবার গ্রীষ্মকাল

 জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। রায়টিকে ‘হতাশাজনক’ ও ‘আইনগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ উল্লেখ করে এর পুনর্বিবেচনার দাবিতে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেছেন তাঁরা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালফাইল ছবি: প্রথম আলো

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে শহীদ পরিবারের আটজন সদস্য স্বাক্ষরিত এই স্মারকলিপিটি রেজিস্ট্রারের কাছে হস্তান্তর করেন।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁরা জাতির ইতিহাসে বীর শহীদ হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন। তাঁদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই দেশ আজ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পথে হাঁটছে। কিন্তু গত সোমবার চানখাঁরপুল মামলার যে রায় ঘোষিত হয়েছে, তা শহীদ পরিবারগুলোকে চরমভাবে হতাশ করেছে। পরিবারগুলোর মতে, এই রায় জুলাই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

স্মারকলিপিতে উঠে আসা চার আপত্তি
ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিষয়ে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে চারটি সুনির্দিষ্ট উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্মারকলিপি অনুযায়ী আপত্তির জায়গাগুলো হলো:

১. আইনি অসামঞ্জস্যতা: ঘটনাস্থলের সুস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও রায়ে তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। শহীদ পরিবারের দাবি, এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং রায়টি আইনগতভাবে যথেষ্ট শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।

২. শাস্তির তারতম্য ও রায়ের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা: রায়ে ‘প্রিন্সিপাল অফেন্ডার’ বা মূল অপরাধীদের লঘু শাস্তি দেওয়া হয়েছে, অথচ ‘সুপিরিয়র’ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরিবারের আশঙ্কা, শাস্তির এই ভারসাম্যহীনতার কারণে ভবিষ্যতে উচ্চ আদালতে এই রায় টেকানো কঠিন হতে পারে।

৩. আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক: চানখাঁরপুলের এই রায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্মারকলিপিতে বলা হয়, এই রায়ের ফলে ১ হাজার ৪০০ শহীদ পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও মর্মাহত হয়েছেন।

৪. নেতিবাচক নজিরের আশঙ্কা: এই রায় ভবিষ্যতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় একটি নেতিবাচক বা ‘বাজে নজির’ (Bad Precedent) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যা সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলবে।

এমতাবস্থায়, ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করতে এবং শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রায়টি পুনর্বিবেচনার (Review) জন্য ট্রাইব্যুনালের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

রায়ের প্রেক্ষাপট
এর আগে, সোমবার (২৬ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চানখাঁরপুল এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আট আসামির সাজা ঘোষণা করেন।

রায়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা জোনের সাবেক এডিসি শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, বাকি পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের এবং শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত।

শহীদ পরিবারের সদস্যরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছে (কনস্টেবল ও জুনিয়র অফিসার), তাদের লঘু দণ্ড এবং কেবল নির্দেশদাতাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় বিচারের পূর্ণাঙ্গতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts