৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:০১ শুক্রবার গ্রীষ্মকাল
যে শান্তির আশায় গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষ কয়েক দিনের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, তা এখন এক দুঃস্বপ্নের প্রতিধ্বনি মাত্র। অক্টোবরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতির কালি শুকানোর আগেই, গাজার আকাশ আবারও ঢেকে গেছে বারুদের ধোঁয়ায়। চুক্তি এখন একটি মৃত অধ্যায়, যার সমাধির ওপর দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ এক নতুন ও ভয়ংকর রূপে ফিরে এসেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য কোনো পরিসংখ্যানের তালিকা নয়, বরং একটি চলমান মানবিক বিপর্যয়ের দৈনিক খতিয়ান। চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত ৯৭টি নিথর দেহ এবং ২৩০ জনের আহতের আর্তনাদ প্রমাণ করে, শান্তি ছিল একটি ক্ষণস্থায়ী বিভ্রম। শুধু ১৯ অক্টোবরের একটি সূর্যোদয় ৪৪টি ফিলিস্তিনি পরিবারের জন্য আর নতুন ভোর আনেনি। গাজা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ইসরায়েলি বাহিনী ৮০ বারেরও বেশি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এবং “আগুনের বেল্ট” নামক এক নির্মম কৌশলের মাধ্যমে আবাসিক এলাকাগুলোকে নিশানা করছে, যা নিছক সামরিক অভিযান নয়, বরং বেসামরিক জীবনকে পরিকল্পিতভাবে বিপর্যস্ত করার সামিল।
এই ধ্বংসযজ্ঞের মঞ্চে সবচেয়ে বিস্ময়কর ভূমিকা পালন করছে বিশ্বশক্তিগুলো। যে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শান্তির দূত সাজার চেষ্টা করেছিল, সেই দেশটিই এখন ইসরায়েলের “আত্মরক্ষার অধিকারের” প্রধান রক্ষক। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জেরুজালেম সফর করে জানিয়ে দিচ্ছেন, হামাস নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে দেওয়া “অবিচল সমর্থন” অব্যাহত থাকবে। এই অবস্থান আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ইসরায়েলের জন্য একটি নীরব সম্মতিপত্র হিসেবে কাজ করছে, যা তাদের অভিযানকে আরও দুঃসাহসী করে তুলেছে।
অন্যদিকে, আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া যেন এক অদ্ভুত নীরবতার চাদরে মোড়া। আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বাইরে তাদের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। মিশর ও কাতার কূটনৈতিক টেবিলে আলোচনা চালিয়ে গেলেও, সেই আলোচনা গাজার আকাশে উড়তে থাকা একটি ড্রোনের শব্দকেও থামাতে পারছে না। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর জোরালো কণ্ঠস্বর যেন তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণের জটিল জালে আটকে গেছে। ফলে, ফিলিস্তিনিদের জন্য ভ্রাতৃত্বের বার্তাগুলো এখন ফাঁপা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আল জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র নিশ্চিত করছে, গাজা সিটি ও রাফায় প্রতিদিনের বিমান ও স্থল হামলায় হাজার হাজার পরিবার আবারও আশ্রয়হীন হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির ভাঙা টুকরোগুলোর ওপর দিয়ে গাজার সংঘাত এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে ফিলিস্তিনিরা একদিকে সামরিক আগ্রাসনের শিকার এবং অন্যদিকে বৈশ্বিক রাজনীতির রঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ও অসহায় এক গুটিতে পরিণত হয়েছে। শান্তির স্বপ্ন এখন কেবলই এক দূরের মরীচিকা, যা বোমার ধোঁয়ায় ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে।
Analysis | Habibur Rahman





