.
আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ফোনের ক্যামেরায় কেন লাল টেপ? নিরাপত্তার আড়ালে জানা গেল আসল রহস্য

Email :17

১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:০২ বুধবার বসন্তকাল

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে আলোচনার শেষ নেই। তবে এবার কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক বা যুদ্ধনীতি নয়, বরং তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর স্মার্টফোনের পেছনের ক্যামেরা ও সেন্সরগুলো লাল রঙের একটি টেপ দিয়ে সম্পূর্ণ ঢাকা। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ও প্রযুক্তিতে উন্নত একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কেন নিজের ফোনের ক্যামেরা ঢেকে রেখেছেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছে হাজারো প্রশ্ন।

নেতানিয়াহুর ফোনের ক্যামেরায় লাল টেপ লাগানোছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ভাইরাল ছবি ও নেটিজেনদের কৌতূহল
ঘটনার সূত্রপাত জেরুজালেমে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট বা নেসেটের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং লটে তোলা একটি ছবিকে কেন্দ্র করে। ছবিতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর বিলাসবহুল কালো গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছেন। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির নেটিজেনদের চোখ এড়িয়ে যায়নি ফোনের পেছনের দৃশ্যটি।

জনপ্রিয় পডকাস্টার মারিও নাওফল প্রথম বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তুলে ধরেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘নেতানিয়াহু কেন তাঁর ফোনের ক্যামেরার ওপর টেপ দিয়ে রেখেছেন? তিনি আসলে কাকে বা কী নিয়ে শঙ্কিত?’ তিনি আরও মন্তব্য করেন, ‘যদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির ফোন হ্যাক হওয়ার ভয়ে এমন পদক্ষেপ নিতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?’

লাল টেপের রহস্য ও নিরাপত্তা কৌশল
প্রযুক্তি বিশ্লেষক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতানিয়াহুর ফোনে লাগানো এই লাল টেপ কোনো সাধারণ স্টিকার নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম হাইপফ্রেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি এক ধরনের বিশেষ ‘সিকিউরিটি স্টিকার’। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং গোপনীয়তা রক্ষার্থে এটি ব্যবহার করা হয়।

স্মার্টফোনের ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন হ্যাক করে দূর থেকে নজরদারি চালানো বা গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়া বর্তমান সাইবার বিশ্বে খুব সাধারণ ঘটনা। বিশেষ করে নেসেটের মতো অত্যন্ত গোপনীয় সরকারি স্থাপনায়, যেখানে স্পর্শকাতর নথিপত্র বা আলোচনার বিষয়বস্তু ক্যামেরাবন্দী হওয়া নিষিদ্ধ, সেখানে এ ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে। ‘ক্ল্যাশ রিপোর্ট’ নামের একটি সংস্থার মতে, এই লাল টেপ মূলত ক্যামেরা লেন্স ও সেন্সরগুলোকে অকেজো করে রাখে, যাতে ভুলবশত বা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে কেউ কোনো গোপন ছবি তুলতে না পারে।

পেগাসাসের জনক যখন নিজেই শঙ্কিত
নেতানিয়াহুর এই সতর্কতাকে অনেকে ‘আয়রনি’ বা পরিহাস হিসেবে দেখছেন। কারণ, ইসরায়েল বিশ্বজুড়ে পরিচিত তাদের উন্নত সাইবার নজরদারি প্রযুক্তির জন্য। ইসরায়েলভিত্তিক এনএসও গ্রুপের তৈরি ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে বিশ্বের বহু দেশের সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানদের ফোনে আড়িপাতার অভিযোগ রয়েছে।

যে দেশটি অন্যের ফোনে নজরদারির জন্য কুখ্যাত প্রযুক্তি তৈরি করেছে, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীর ফোনেই নিরাপত্তার জন্য টেপ লাগাতে হচ্ছে—বিষয়টি সাইবার নিরাপত্তার ভয়াবহতাকেই ইঙ্গিত করে। ২০২২ সালে ইসরায়েলি পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছিল যে, তারা আদালতের অনুমতি ছাড়াই সাধারণ নাগরিক ও অ্যাকটিভিস্টদের ফোনে নজরদারি চালিয়েছিল।

সাধারণ মানুষের জন্য বার্তা
বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, স্মার্টফোন এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি ‘পকেট স্পাই’ বা গোয়েন্দা যন্ত্রে পরিণত হতে পারে। মারিও নাওফলের কথায় সুর মিলিয়ে প্রযুক্তিবিদরাও বলছেন, রাষ্ট্রপ্রধানরা যদি হ্যাকিং থেকে বাঁচতে ক্যামেরায় টেপ লাগান, তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও নিজেদের ডিজিটাল গোপনীয়তা বা ‘ডিজিটাল প্রাইভেসি’ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

ইসরায়েলে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে টিকটকের মতো অ্যাপ এবং নির্দিষ্ট কিছু ডিভাইসের ওপর আগে থেকেই কড়াকড়ি রয়েছে। তবে খোদ প্রধানমন্ত্রীর ফোনের ক্যামেরায় লাল টেপ—সাইবার যুদ্ধের এই যুগে গোপনীয়তা রক্ষার এক প্রতীকী চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts