.
জাতীয়

বড় দুর্নীতি কমলেও থামেনি ‘বদলি বাণিজ্য’, কলেজ বদলিতেই গুনতে হয় ৮ লাখ টাকা: পরিকল্পনা উপদেষ্টা

Email :29

৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৫৩ শনিবার বসন্তকাল

 অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বড় আকারের দুর্নীতি বা লুটপাট দৃশ্যত কমলেও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো ছোট ও মাঝারি আকারের দুর্নীতি জেঁকে বসে আছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বর্তমানেও একটি কলেজে বদলির জন্য ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব তথ্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আজ অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বক্তব্য রাখছেন। রাজধানীর কারওয়ানবাজারে এই অনুষ্ঠান হয়ছবি– প্রথম আলো

বুধবার (আজ) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অর্থনৈতিক বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত সদস্যদের সন্তানদের বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বদলি ও মামলা বাণিজ্যের বিস্তার
বক্তৃতায় পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকারের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বড় দুর্নীতিগুলোতে লাগাম টানা সম্ভব হয়েছে। তবে দুর্নীতির ধরন বদলেছে। এখন ‘মামলা বাণিজ্য’ এবং ‘বদলি বাণিজ্য’ প্রকট আকার ধারণ করেছে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘কলেজ পর্যায়ে একজন শিক্ষক বা কর্মচারীকে বদলি করতে হলে এখনো ৮ লাখ টাকা লেনদেন হয়। বিষয়টি আমি গোয়েন্দা সংস্থাকে জানিয়েছিলাম, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা এর কোনো সুরাহা করতে বা তথ্য বের করতে পারেনি।’’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘তদবির’ সংস্কৃতি
শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের সময়কার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তদবিরের চাপ অবিশ্বাস্য। বিগত সরকারের আমলের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘‘আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলেই কাজ হয়ে যেত, কাউকে মন্ত্রণালয়ে সশরীরে আসতে হতো না। আর এখন মানুষ মনে করে নতুন সুযোগ এসেছে, তাই দলে দলে মন্ত্রণালয়ে ভিড় করছে।’’ তিনি জানান, তদবিরকারীদের ভিড় ঠেলে তাকে নিজের কক্ষে প্রবেশ করতে হতো।

অর্থনীতির হালচাল ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি
দেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উপদেষ্টা জানান, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অবস্থা থেকে অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। তিনি বলেন, ‘‘আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল অর্থনীতি ভালো চলছে, কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ব্যাংক খাতের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল, যা সাধারণের চোখে পড়েনি। বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার কারণে বাজেটের কাঠামোই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।’’

চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের আশেপাশে থাকতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত হারে কমেনি।

বিগত সরকারের সমালোচনা ও অভ্যুত্থান প্রসঙ্গ
আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচনা করে প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, যারা দুর্নীতি ও অন্যায়ের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে দিয়ে গেছেন, তারা বুঝেশুনেই এটি করেছেন। ২০২৪ সালে যদি গণ-অভ্যুত্থান নাও হতো, তবে অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতির কারণে পরবর্তীতে এমনিতেই বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটত।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সতর্কতা
বর্তমান সরকারকে ‘এনজিও সরকার’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, এই সরকার মূলত গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের সরকার। তবে যুব সমাজের অস্থিরতা এবং শিক্ষাঙ্গনের অস্থিতিশীলতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং শিক্ষাঙ্গনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আগামী সরকারের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

অনুষ্ঠান ও সম্মাননা
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগঠনের সদস্যদের মেধাবী সন্তানদের হাতে বৃত্তি তুলে দেওয়া হয়। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আবদুল মোমেনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts