১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৮:২৫ সোমবার বসন্তকাল
ইরানে চলমান নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যেকার বাকযুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে। খামেনির কঠোর সমালোচনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা জবাব দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং দেশটিতে এখন ‘নতুন নেতৃত্ব’ আনার সময় এসেছে।
শনিবার সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরাসরি খামেনির নেতৃত্বকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “ইরান এখন বিশ্বের সবচেয়ে বসবাসের অযোগ্য রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এর একমাত্র কারণ দেশটির দুর্বল ও ব্যর্থ নেতৃত্ব। সময় এসেছে ইরানে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার, যারা দেশটিকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারবে।”
খামেনির আক্রমণ ও ট্রাম্পের পাল্টা আঘাত
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের ঠিক আগেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি এক জনসমাবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। খামেনি অভিযোগ করেন, ইরানে চলমান সহিংসতা এবং প্রাণহানির পেছনে মূল কলকাঠি নাড়ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “ইরানি জনগণের রক্তপাত, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং তাদের ওপর মিথ্যা অপবাদ চাপানোর সম্পূর্ণ দায় এই ব্যক্তির। তিনি উসকানিদাতাদের উৎসাহিত করছেন।”
খামেনির এই বক্তব্যের জবাবে ট্রাম্প ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ বেছে নেন। তিনি খামেনিকে একজন ‘অসুস্থ ব্যক্তি’ (Sick Man) হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “মানুষ হত্যা বন্ধ করে তার উচিত নিজের দেশের দিকে মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু তিনি তা করতে ব্যর্থ।”
বিক্ষোভ ও প্রাণহানি: সরকারি স্বীকারোক্তি
ইরানে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়ে এতদিন ধোঁয়াশা থাকলেও, খামেনি তার ভাষণে প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছেন যে, বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে ইরানি কর্তৃপক্ষ নিহতের সংখ্যা কয়েকশ বললেও, খামেনির এই স্বীকারোক্তি পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে সরকারিভাবে নিশ্চিত করল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA)-এর তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩,০৯০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২২,১২৩ জনকে। সংস্থাটি জানিয়েছে, সরকারিভাবে সঠিক তথ্য প্রকাশ না করায় তারা নিজস্ব সোর্স ও ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে।
ফাঁসি ও মার্কিন দাবি নিয়ে ধোঁয়াশা
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের বিচার ব্যবস্থার একটি সিদ্ধান্তের প্রশংসাও করেন, তবে তা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে ৮০০ জনের মৃত্যুদণ্ড বাতিলের সিদ্ধান্তকে তিনি সম্মান জানান। তবে হোয়াইট হাউস থেকে এই ‘৮০০ জন’ এর তথ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট উৎস নিশ্চিত করা হয়নি।
এর আগে বৃহস্পতিবার ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির দণ্ড কার্যকর স্থগিত করা হয়েছে। ট্রাম্পের ৮০০ জনের প্রাণ বাঁচানোর দাবি এবং ইরানের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দেখা যাচ্ছে।
সামরিক প্রস্তুতি ও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও বাড়ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এবং ইরানের যেকোনো পাল্টা হামলা মোকাবিলায় পেন্টাগন ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ওই অঞ্চলে মোতায়েন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইরান সরকারের দাবি, বিক্ষোভ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং প্রধান উসকানিদাতাদের আটক করা হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই আহ্বানের পর বিক্ষোভকারীরা নতুন করে চাঙ্গা হবে নাকি পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী মিশন ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। Analysis | Habibur Rahman
