.
বাংলাদেশ

জনবিস্ফোরণের চূড়ান্তলগ্নে ঢাকা: ২০৫০ সালে বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল নগরী হওয়ার ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ

Email :80

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৪৫ সোমবার বসন্তকাল

 মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে বৈশ্বিক জনবহুল শহরের তালিকায় নবম স্থান থেকে এক লাফে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তাকে হটিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরীর তকমা জুটবে ঢাকার কপালে। এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ সামলে একটি বাসযোগ্য শহর হিসেবে টিকে থাকাই এখন ঢাকার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। গত ১৮ নভেম্বর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি ঢাকার নগর পরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে (২০২৫) বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর জাকার্তা, যেখানে প্রায় ৪ কোটি ১৯ লাখ মানুষ বাস করে। এর ঠিক পরেই ৩ কোটি ৬৬ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। একসময়ে তালিকার শীর্ষে থাকা জাপানের টোকিও এখন তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। জাতিসংঘের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালে জাকার্তাকে পেছনে ফেলে ঢাকা তালিকার শীর্ষে উঠে আসবে। তখন ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৫ কোটি ২১ লাখে, যেখানে জাকার্তার জনসংখ্যা হবে ৫ কোটি ১৮ লাখ। অর্থাৎ, আগামী ২৫ বছরে ঢাকা আরও জনাকীর্ণ হয়ে উঠবে, যা শহরের সীমিত সম্পদের ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করবে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার এই অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঢাকায় সুযোগ-সুবিধার কেন্দ্রীকরণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম জানান, গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলোর জন্য মানুষ রাজধানীকেই একমাত্র ভরসাস্থল মনে করছে। তিনি বলেন, “গ্রামে কৃষিজমি কমে যাওয়া এবং নদীভাঙনের মতো কারণে ভূমিহীন মানুষ জীবন বাঁচাতে ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। এই অভিবাসনের হার দেশের স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে দ্বিগুণ।”


বর্তমানেই ঢাকার গণপরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আবাসন খাত ধুঁকছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ উসওয়াতুন মাহেরা বলেন, “প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ নতুন মানুষ ঢাকায় যুক্ত হচ্ছে। এই বাড়তি মানুষের জন্য আবাসন, পানি ও বায়ু দূষণ রোধ করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে এবং অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ রোধ না করলে ভবিষ্যতে মৌলিক চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।


২০৫০ সালের সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞরা এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে ‘বিকেন্দ্রীকরণ’ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

১. বাণিজ্যিক বিকেন্দ্রীকরণ: অধ্যাপক মঈনুল ইসলামের মতে, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সদর দপ্তরগুলো ঢাকা থেকে সরিয়ে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করতে হবে। এতে কর্মসংস্থানের জন্য মানুষের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে।

২. শক্তিশালী স্থানীয় সরকার: নাগরিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

৩. সমন্বিত নগর পরিকল্পনা: উসওয়াতুন মাহেরা জোর দেন টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর। বিচ্ছিন্নভাবে ফ্লাইওভার বা ভবন নির্মাণ না করে, পুরো শহরের ধারণক্ষমতা বিবেচনা করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

৪. মফস্বল ও গ্রামের উন্নয়ন: গ্রাম ও মফস্বল শহরে মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে।


২০২৫ সালের তালিকায় ঢাকার পরে অবস্থান করছে টোকিও, নয়াদিল্লি এবং সাংহাই। তবে ২০৫০ সাল নাগাদ টোকিও তালিকার ৭ নম্বরে নেমে যাবে এবং তাদের জনসংখ্যা কমে ৩ কোটি ৭ লাখে দাঁড়াবে। উল্টো চিত্র দেখা যাবে ঢাকার ক্ষেত্রে। অন্য মেগাসিটিগুলো যখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনছে বা কমাচ্ছে, ঢাকা তখন হাঁটছে উল্টো পথে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনটিকে ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে নিয়ে এখনই দীর্ঘমেয়াদী নগরনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন না করলে, ২০৫০ সালে ঢাকা একটি অকার্যকর নগরীতে পরিণত হতে পারে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts