১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৪৬ সোমবার বসন্তকাল
বাবার করা ঋণের খেসারত দিতে হলো কিশোর ছেলেকে। পাওনা টাকা আদায়ে বাবাকে খুঁজে না পেয়ে দশম শ্রেণির এক পরীক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে এক মহাজনের বিরুদ্ধে। শনিবার সন্ধ্যায় রাজশাহী নগরী থেকে তাকে তুলে নেওয়ার ফলে রোববার কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি ওই শিক্ষার্থী।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার মুংলী গ্রামের এক পরিবারের সঙ্গে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা সেলিম হোসেন ঋণের দায়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পলাতক রয়েছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (৯ নভেম্বর) ওই শিক্ষার্থীর কারিগরি বোর্ডের একটি ট্রেড পরীক্ষা ছিল। কেন্দ্র ছিল রাজশাহী শহরের লোকনাথ উচ্চবিদ্যালয়ে। পরীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সে চারঘাট থেকে শহরে তার খালার বাসায় এসেছিল। কিন্তু পরীক্ষার আগের দিন শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর ভুবনমোহন পার্ক এলাকা থেকে তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যান সোহান নামের এক ব্যক্তি। সোহান চারঘাট উপজেলার ফরিদপুর এলাকার বাসিন্দা এবং ওই কিশোরের বাবার কাছে টাকা পান বলে দাবি করেন।
টানা এক বছর ধরে পলাতক বাবা সেলিম হোসেনের কারণে এর আগেও ছেলেটির শিক্ষাজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছিল। গত এপ্রিলে বাবার আত্মগোপনের কারণে সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। পরে তাকে কারিগরি বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। এবার পাওনাদারের রোষানলে পড়ে সেই পরীক্ষাও দেওয়া হলো না তার।
অভিযুক্ত সোহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে ছেলেটি তাঁর জিম্মায় রয়েছে। তাঁর দাবি, ছেলেটির বাবা সেলিম হোসেন তাঁর কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ওই টাকা উদ্ধারের জন্য চাপ সৃষ্টি করতেই ছেলেকে আটকানো হয়েছে। সোহানের ভাষ্যমতে, ‘ছেলেটির কোনো ক্ষতি করা হচ্ছে না। তাকে যত্ন করে রাখা হয়েছে, এমনকি আমি নিজে জেগে থেকে তাকে ঘুম পাড়াচ্ছি।’
মানবিক দিক বিবেচনা করে কেন তাকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হলো না—এমন প্রশ্নের জবাবে সোহান জানান, সেলিম হোসেনের কাছে তিনি ছাড়াও এলাকার আরও অনেকে টাকা পান। সবার সিদ্ধান্তেই ছেলেটিকে আটকে রাখা হয়েছে। সেলিম হোসেন বা তাঁর স্বজনরা যোগাযোগ করে সমঝোতা করলেই কেবল তাকে ছাড়া হবে।
এদিকে শিক্ষার্থীর স্বজনদের অভিযোগ, ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁরা রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানা ও চারঘাট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের অভিযোগ আমলে নেয়নি। এমনকি ছেলেটির দাদি হোসনে আরা বেগম পাওনাদারদের কাছে গিয়েও নাতিকে ফেরত আনতে ব্যর্থ হন।
সরেজমিনে চারঘাটের মুংলী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সেলিম হোসেনের ইলেকট্রনিকসের দোকান ও বাড়ি তালাবদ্ধ। বাড়িতে কেবল তাঁর বৃদ্ধা মা হোসনে আরা বেগম রয়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছেলে ঋণের দায়ে পালিয়েছে, কিন্তু নাতি কী দোষ করল? টাকার জন্য অনেকে বাড়িতে আসে, হুমকি দেয়। এখন নাতিটাকেও ওরা আটকে রাখল।’
অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, পুলিশের সঙ্গে মৌখিক পরামর্শ করেই তারা ছেলেটিকে নিজেদের হেফাজতে রেখেছেন। তবে এ বিষয়ে চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বাবার অপরাধ বা ঋণের দায়ভার কেন অপ্রাপ্তবয়স্ক পরীক্ষার্থী ছেলের ওপর বর্তাবে এবং পুলিশ কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না—তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
Analysis | Habibur Rahman