১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট আস্থা সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পুলিশ পেতে যাচ্ছে নতুন লৌহবর্ণের পোশাক। তবে এই প্রতীকী পরিবর্তন কি বাহিনীর কর্মপদ্ধতি ও ভাবমূর্তিতে কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবে? নাকি এটি কেবল সমালোচনার পুরোনো ক্ষত ঢাকার একটি বাহ্যিক প্রচেষ্টা? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরছে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মনে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে পুলিশ সদস্যরা এই নতুন পোশাক পরা শুরু করবেন। সরকারের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে শুধু পোশাক বদল হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং একে মানসিকতা ও আচরণের আমূল পরিবর্তনের সূচনাকারী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, “পোশাকের সাথে সাথে মনমানসিকতাও বদলাতে হবে।” বাহিনীর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য আনতে র্যাবের জন্য জলপাই এবং আনসারের জন্য সোনালি গমের রঙ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শনাক্ত করতে সহজ করবে।
তবে এই উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, সমস্যার মূলে না গিয়ে কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনে কোনো সুফল আসবে না। বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ এই পদক্ষেপকে একটি “সস্তা কৌশল” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এর আগেও একাধিকবার পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু তা বাহিনীর আচরণগত উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “পোশাক দিয়ে চরিত্র বদলানো যায় না। পোশাকের সাথে চরিত্রের কোনো সম্পর্ক নেই।”
একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব বিভাগের ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, নতুন পোশাকের চেয়েও এখন বেশি জরুরি পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং তাদের কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, মূল সমস্যাটি প্রাতিষ্ঠানিক।
বিশ্লেষকরা একমত যে, পুলিশের প্রকৃত সংস্কারের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন কর্মপরিবেশ তৈরি করা। যেখানে পুলিশ সদস্যরা কোনো অবৈধ বা অনৈতিক আদেশ মানতে বাধ্য থাকবেন না এবং শুধুমাত্র আইন অনুযায়ী কাজ করার সাহস ও সুরক্ষা পাবেন। তাদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ এবং পদোন্নতিতে পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিলে কেবল পোশাক বদলানো একটি অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে।
সুতরাং, এই নতুন পোশাক একদিকে যেমন একটি নতুন সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে এটি সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষাও। জনগণ এখন তাকিয়ে থাকবে, এই লৌহবর্ণের পোশাক পরা পুলিশ সদস্যরা কি কেবল দেখতেই নতুন হবেন, নাকি তাদের সেবা ও আচরণেও সততা ও পেশাদারিত্বের প্রতিফলন ঘটবে। সময় বলে দেবে, এই পরিবর্তন কি জনগণের আস্থা অর্জনের পথে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ, নাকি কেবলই সমালোচনার ঝড় সামলানোর একটি সাময়িক আবরণ।
Analysis | Habibur Rahman


