.
জাতীয়

ডিজেলের অজুহাত, ‘গায়েবি খরচের’ খেলা—বাসভাড়া বাড়ছে, কিন্তু সত্য কোথায়?

Email :1

বাসভাড়া বাড়ানোর আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়—বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু স্তরের প্রশ্ন, অসঙ্গতি এবং বিতর্ক।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) নেতৃত্বাধীন ভাড়া পুনর্নির্ধারণ কমিটি বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২২ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। অথচ শুধুমাত্র ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি হিসাব করলে ভাড়া বাড়ার কথা ছিল প্রায় ১৫ পয়সা। এই অতিরিক্ত ৭ পয়সা কোথা থেকে এলো—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

মালিকপক্ষ বলছে, জ্বালানির পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিন অয়েল, টায়ার, লুব্রিকেন্টসহ নানা খরচ বেড়েছে। সেই হিসেবে ভাড়া বাড়ানো যৌক্তিক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, এই খরচগুলোর মধ্যে কিছু আছে যেগুলো বাস্তবে ততটা দৃশ্যমান নয়—যেগুলোকে অনেকে “গায়েবি খরচ” বলছেন। অর্থাৎ কাগজে-কলমে দেখানো খরচ আর বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে।

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কমিটির গঠন। ১১ সদস্যের এই কমিটিতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলক বেশি, আর যাত্রীদের প্রতিনিধি মাত্র একজন। ফলে সিদ্ধান্ত কতটা ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই।

বাসের ব্যয় বিশ্লেষণেও রয়েছে বেশ কিছু অসঙ্গতি। উদাহরণস্বরূপ, একটি নতুন বাসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, গ্যারেজ খরচ, এমনকি চালক-সহকারীদের বোনাসও হিসাবের মধ্যে রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে শহরের অধিকাংশ বাসের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন—লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি, রাস্তায় পার্কিং, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ—এসবই সাধারণ চিত্র। তাহলে প্রশ্ন আসে, এই হিসাবগুলো কি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাসের আয়ুষ্কাল। ভাড়া নির্ধারণে যেখানে ১০ বছর ধরা হয়, বাস্তবে অনেক বাস ২০ বছর পর্যন্ত চলাচল করে। অর্থাৎ পুরনো বাস থেকেও নতুন বাসের মতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে—যা যাত্রীদের কাছে অন্যায্য মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২২ সালেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর একইভাবে ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু পরে তেলের দাম কমলেও ভাড়া কমেনি। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই অনেকেই আশঙ্কা করছেন—এবারও একই চিত্র দেখা যেতে পারে।

বর্তমানে প্রস্তাব অনুযায়ী মহানগরে বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৬৪ পয়সা হতে পারে। দূরপাল্লার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এই বাড়তি ভাড়া সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে—যারা ইতোমধ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে রয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আর শুধু ভাড়া বাড়ানো বা না বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মূল প্রশ্ন হলো—এই ভাড়া নির্ধারণ কতটা স্বচ্ছ, কতটা যুক্তিসঙ্গত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এটি কি সত্যিই জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে?

যদি এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া যায়, তাহলে বাসভাড়া বৃদ্ধি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং এটি হয়ে উঠবে আস্থার সংকটের আরেকটি উদাহরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts