১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১০ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৬:২৮ শনিবার বসন্তকাল
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে অন্যতম বড় ধাক্কা খেল স্বনামধন্য পত্রিকা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’। প্রতিষ্ঠানটি বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাদের মোট কর্মীবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশকে ছাঁটাই করেছে। এই গণছাঁটাইয়ের তালিকায় নিউজরুমের সাংবাদিক থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট—বাদ পড়েননি কেউই। চাকরি হারানোদের তালিকায় রয়েছেন ভারতের প্রবীণ কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের ছেলে ও বিশিষ্ট সাংবাদিক ঈশান থারুর।

নিউজরুমে হাহাকার: একদিনেই বেকার তিন শতাধিক সাংবাদিক
বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতার মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ওয়াশিংটন পোস্টের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন চরম অস্থিতিশীল। জানা গেছে, বুধবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে নিউজরুম বা সংবাদকক্ষ থেকেই তিন শতাধিক কর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ছাঁটাই হওয়া কর্মীর সংখ্যা প্রতিষ্ঠানের মোট জনবলের প্রায় ৩৩ শতাংশ। খরচ কমানোর দোহাই দিয়ে এই বিপুল সংখ্যক কর্মীকে বিদায় করার ঘটনায় মার্কিন গণমাধ্যম জগতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
শশী থারুরের ছেলের বিদায়
এই ছাঁটাই অভিযানে বাদ পড়েছেন পত্রিকাটির দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট ঈশান থারুর। তিনি ভারতের লোকসভার সদস্য শশী থারুরের পুত্র। ঈশান দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন পোস্টে পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করে আসছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় ঈশান নিজেই তাঁর চাকরি হারানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মালিক বেজোসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
২০১৩ সালে ২৫ কোটি ডলারে অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস যখন ওয়াশিংটন পোস্ট কিনেছিলেন, তখন অনেকেই আশা করেছিলেন পত্রিকাটি নতুন প্রাণ পাবে। কিন্তু এক যুগেরও বেশি সময় পর এই গণছাঁটাইয়ের ঘটনায় বেজোসের মালিকানা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
পত্রিকার কর্মীদের একাংশ এবং ইউনিয়ন নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হয়েও বেজোস কেন পত্রিকার লোকসান সামাল দিতে কর্মীদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছেন? অনেক সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, বেজোস যদি বিনিয়োগ করতে না চান, তবে তিনি যেন পত্রিকাটি বিক্রি করে দেন।
‘দ্য পোস্ট গিল্ড’ এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে, “বছরের পর বছর ধরে ওয়াশিংটন পোস্ট সাংবাদিকতার মাধ্যমে কোটি মানুষকে সেবা দিয়েছে। জেফ বেজোস যদি আর বিনিয়োগে আগ্রহী না হন, তবে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন কোনো অভিভাবক খোঁজা উচিত।”
কর্তৃপক্ষের সাফাই
এত বড় ছাঁটাইয়ের পরেও পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে মালিকপক্ষের হয়ে সাফাই গেয়েছেন। সিএনএন-কে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, জেফ বেজোস এখনো পত্রিকার উন্নয়নের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মারে বলেন, “বেজোস চান ওয়াশিংটন পোস্ট সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও বড় এবং সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। বুধবারের ঘটনাকে একটি ‘নতুন দিনের সূচনা’ হিসেবে দেখা উচিত।”
মারে আরও জানান, জেফ বেজোস মালিক হিসেবে সংবাদে কোনো হস্তক্ষেপ করেন না এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তবে তিনি লোকসান কমিয়ে পত্রিকাকে আর্থিকভাবে লাভজনক করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও মারের এই বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারছেন না ছাঁটাই আতঙ্কে থাকা বাকি কর্মীরা। তাদের মতে, বিপুল সংখ্যক কর্মী কমিয়ে কোনোভাবেই একটি প্রতিষ্ঠানের মান ও ব্যাপ্তি বাড়ানো সম্ভব নয়।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু একদিনে এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের পর ওয়াশিংটন পোস্ট তার আগের জৌলুস বা সংবাদ কাভারের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া বিশ্লেষকরা।
Analysis | Habibur Rahman