.
আন্তর্জাতিক

পশ্চিমা বিশ্বে যখন দুয়ার বন্ধ, তখন ৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে বৈধ করছে স্পেন: অর্থনীতি ও মানবতার নতুন বার্তা

Email :14

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৩ সোমবার বসন্তকাল

বিশ্বজুড়ে যখন অভিবাসীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আর সীমান্তে কঠোর নজরদারি চলছে, তখন স্রোতের একদম বিপরীতে হেঁটে যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত নিল ইউরোপের দেশ স্পেন। দেশটির সরকার ঘোষণা দিয়েছে, স্পেনে বসবাসরত প্রায় ৫ লাখ নথিপত্রহীন বা অবৈধ অভিবাসীকে বৈধ হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি এবং ইউরোপের প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থানের বিপরীতে স্পেনের এই ‘উদারনীতি’ বিশ্বমঞ্চে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে স্পেনে ১ লাখ ৭ হাজার ৪০৯ জন নথিপত্রহীন অভিবাসী ছিলেনফাইল ছবি: রয়টার্স

কারা পাচ্ছেন এই সুযোগ?
স্পেনের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বাধীন জোট সরকার জানিয়েছে, এই বৈধকরণ প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হলো দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং মানবাধিকার রক্ষা করা। নতুন এই নীতিমালার আওতায় সেই সব বিদেশি নাগরিক বৈধ হওয়ার আবেদন করতে পারবেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ নেই।

শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারীদের অবশ্যই ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে থেকে স্পেনে অবস্থান করতে হবে এবং সেই অবস্থানের মেয়াদ কমপক্ষে পাঁচ মাস হতে হবে। বৈধতার অনুমোদন পেলে প্রাথমিকভাবে তাদের এক বছরের জন্য স্পেনে বসবাসের অনুমতি (রেসিডেন্সি পারমিট) দেওয়া হবে, যা পরবর্তীতে নবায়নযোগ্য।

সরকার জানিয়েছে, আগামী এপ্রিল মাস থেকে এই বৈধকরণ প্রক্রিয়ার আবেদন গ্রহণ শুরু হবে এবং তা চলবে জুন মাস পর্যন্ত।

অর্থনীতির চাকা সচল রাখার কৌশল
স্পেনের সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসনবিষয়কমন্ত্রী এলমা সাইজ এই ঘোষণাকে দেশটির জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি অভিবাসন মডেল তৈরি করতে চাইছি, যা মানবাধিকার রক্ষা এবং সামাজিক সহাবস্থানের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্পেনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হলো তাদের অর্থনীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় স্পেন ভালো পারফর্ম করছে। ২০২৫ সালে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ ছোঁবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো দেশটির বেকারত্বের হার। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম স্পেনে বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অর্থনীতির এই গতি ধরে রাখতে দেশটির শ্রমবাজারে প্রচুর কর্মীর প্রয়োজন, যা মেটাতেই অভিবাসীদের বৈধ করার এই উদ্যোগ।

পরিসংখ্যান কী বলছে?
স্পেনে অবৈধ অভিবাসীদের সংখ্যা গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। দেশটির চিন্তক প্রতিষ্ঠান বা থিংক-ট্যাংক ‘ফাঙ্কাস’-এর দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালে স্পেনে নথিপত্রহীন অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৪০৯ জন। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা প্রায় ৮ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ জনে।

বর্তমানে স্পেনে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তাদের একটি বিশাল অংশ লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে আগত। এর মধ্যে কলম্বিয়া, পেরু এবং হন্ডুরাসের নাগরিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

ইউরোপে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত
ইউরোপের রাজনীতিতে যখন ডানপন্থীদের উত্থান ঘটছে এবং অভিবাসীদের বোঝা হিসেবে দেখা হচ্ছে, তখন স্পেনের বামপন্থী সরকার হাঁটছে ভিন্ন পথে। তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে, অভিবাসীরা অর্থনীতির বোঝা নয় বরং সম্পদ। শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণ এবং বয়স্ক জনসংখ্যার দেশটিতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে অভিবাসীদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগ স্পেনের জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts