.
রাজনীতি

রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতে জাতীয় ঐক্যের ডাক: টাইম ম্যাগাজিনে তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আত্মোপলব্ধি

Email :27

৯ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২৩শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৩রা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ২:৩৭ সোমবার বসন্তকাল

দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে দেশে ফেরার পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক কোনো গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘টাইম’-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের জনগণের হৃত রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধারে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। গত বুধবার টাইম ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, জুলাই অভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত চড়াই-উতরাই নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে টাইমের প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আত্মবিশ্বাস
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজের সক্ষমতা ও পরিকল্পনা নিয়ে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন বিএনপি প্রধান। তিনি টাইম-কে বলেন, “আমি আমার পরিকল্পনার অন্তত ৩০ শতাংশও যদি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হই, তবে আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের মানুষ আমাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেবেন।”

টাইম-এর প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশে যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে, তা দেশকে পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ম্যাগাজিনটি উল্লেখ করেছে, দীর্ঘ প্রবাস জীবন তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে আরও পরিপক্ব করেছে এবং আত্মোপলব্ধির সুযোগ দিয়েছে, যা তাকে জনগণের প্রকৃত নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।

জুলাই অভ্যুত্থান ও শহীদের প্রতি দায়বদ্ধতা
শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো প্রায় ১,৪০০ বিক্ষোভকারীর আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, “যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত শক্তিশালী ও গভীর দায়বদ্ধতা রয়েছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই শহীদের রক্তের মর্যাদা দিতে এবং জনগণ যাতে তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান, তা নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

দেশে ফেরা এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি
টাইম-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তারেক রহমানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল চরম নাটকীয় ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে পা রাখলে লাখো জনতা তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানায়। কিন্তু এই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তিনি হারান তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।

মায়ের জানাজায় ঢাকার রাজপথে জনসমুদ্রের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়, অশ্রুসজল চোখে তারেক রহমান তখন বলেছিলেন, “আমার হৃদয় বড় বেশি দুঃখভারাক্রান্ত। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে আমি এই শিক্ষা পেয়েছি যে, যখন কোনো দায়িত্ব আপনার ওপর অর্পিত হয়, তখন আপনাকে অবশ্যই তা পালন করতে হবে।”

জনসমর্থন বনাম অতীত সমালোচনা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তারেক রহমানকে তার সমর্থকরা নিপীড়নের শিকার একজন ‘মুক্তিদাতা’ হিসেবে দেখেন, যিনি সংকটময় মুহূর্তে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে, বিরোধীরা তাকে পারিবারিক সূত্রে পাওয়া নেতৃত্বের সুবিধভোগী হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে এই অভিযোগ খণ্ডন করে তারেক রহমান বলেন, “আমি আমার বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার কারণে এই অবস্থানে আসিনি। আমার দলের সমর্থকদের ভালোবাসা ও সমর্থনের কারণেই আজ আমি এখানে পৌঁছেছি।”

জনসমর্থনের পাল্লাও তারেক রহমানের দিকেই ভারী বলে উল্লেখ করেছে টাইম। ডিসেম্বরের শেষ দিকে পরিচালিত একটি জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিএনপির প্রতি দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে, যেখানে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ।

তবে সংস্কারপন্থীদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে টানা চারবার বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। সমালোচকদের আশঙ্কা, স্বৈরাচার পতনের পর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতায় যেন পুনরায় কোনো স্বার্থপর অভিজাততন্ত্রের উত্থান না ঘটে।

নির্যাতন, আইনি লড়াই এবং শারীরিক যন্ত্রণা
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার সকল দণ্ড বাতিল হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তারা (তৎকালীন সরকার ও অভিযোগকারীরা) কোনো কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।”

প্রতিবেদনে ২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারেক রহমানের কারাবাসের ভয়াবহ দিনগুলোর কথাও উঠে এসেছে। সে সময় অর্থ আত্মসাৎ ও গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ ৮৪টি মামলায় তাকে ১৮ মাস বন্দী রাখা হয়েছিল। কারাগারে থাকাকালীন নির্যাতনের ফলে তার মেরুদণ্ডে যে জখম হয়েছিল, তা আজও তাকে ভোগাচ্ছে। মূলত চিকিৎসার জন্যই তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন।

নিজের শারীরিক যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “খুব বেশি শীত পড়লে আমার পিঠের ব্যথা বেড়ে যায়। তবে আমি এই ব্যথকে জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার স্মারক হিসেবেই দেখি।” তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “ভবিষ্যতে যাতে আর কাউকে এমন পরিস্থিতির শিকার না হতে হয়, সেজন্যই আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে।”

টাইম-এর এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশ পেল, যখন বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এবং সবার দৃষ্টি এখন তারেক রহমান ও তার দলের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts