৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৫১ শনিবার বসন্তকাল
গত শনিবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক পর্ষদের সভাটি ছিল নজিরবিহীন। প্রায় আট ঘণ্টা ধরে চলা এই ম্যারাথন বৈঠকের এজেন্ডায় বা পূর্বনির্ধারিত আলোচ্যসূচিতে অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের নাম ছিল না। অথচ দীর্ঘ আলোচনার এক ফাঁকে প্রভাবশালী এক পরিচালকের আকস্মিক প্রস্তাব এবং তাতে আরও দুজনের সমর্থন—সব মিলিয়ে সভার মোড় ঘুরে যায় সাকিবের দিকে। শেষ পর্যন্ত নাটকীয়ভাবে সিদ্ধান্ত আসে, জাতীয় দলের দুয়ার সাকিবের জন্য আবারও উন্মুক্ত রাখা হবে।

এজেন্ডার বাইরে ‘সারপ্রাইজ’ প্রস্তাব
সাধারণত বিসিবির নীতি অনুযায়ী, সভার আলোচ্য বিষয়গুলো পরিচালকদের আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শনিবারের বৈঠকে সাকিবের বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত এবং পরিচালক ইশতিয়াক সাদেকের পদত্যাগের গুঞ্জনের ভিড়ে সাকিবের প্রসঙ্গটি বিস্ময়ের জন্ম দেয়। সভা শেষে বিসিবি পরিচালক আমজাদ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, সাকিবকে বিবেচনায় নেওয়ার সিদ্ধান্তটি পরিচালকদের ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ গৃহীত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপে না খেলার ব্যর্থতা এবং বোর্ডের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আড়াল করতেই হয়তো তড়িঘড়ি করে সাকিবের মতো বড় ইস্যুকে সামনে আনা হয়েছে।
শর্তের বেড়াজাল ও আইনি বাস্তবতা
সাকিবকে দলে ফেরানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও জুড়ে দেওয়া হয়েছে কঠিন সব শর্ত। নির্বাচকদের সবুজ সংকেত এবং ফর্ম-ফিটনেসের পাশাপাশি বলা হয়েছে, ‘যে ভেন্যুতে খেলা হবে, সেখানে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা থাকতে হবে।’ মূলত এখানেই আটকে আছে সাকিবের ভাগ্য।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই সাকিব আল হাসান দেশের বাইরে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের এমপি হওয়ার সুবাদে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। এ ছাড়া শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির অভিযোগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার খড়গও ঝুলছে তার ওপর। জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। এমতাবস্থায় দেশে পা রাখলে তার গ্রেপ্তার হওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে। এই ‘প্রবাসী’ জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি কীভাবে ভেন্যুতে উপস্থিত থাকবেন, সে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
সরকারের অবস্থানে কি পরিবর্তন?
সাকিবের ফেরা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সরকারের অবস্থান। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া গত সেপ্টেম্বরে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, সাকিবকে দেশে ফিরতে না দেওয়া এবং বাংলাদেশের পতাকা বহন করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দৃশ্যপট কিছুটা বদলেছে বলে বিসিবির ধারণা।
বিসিবির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দিন দশেকের আগেই সরকারের সঙ্গে বোর্ডের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালকের মতে, সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত বা ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পরেই বোর্ড সাকিবকে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সাকিবের আইনি জটিলতা ও নিরাপত্তা ইস্যু সুরাহা করার। তবে বর্তমান ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ক্রিকেটীয় সমীকরণ ও ২০২৭ বিশ্বকাপ
মাঠের বাইরের বিতর্ক থাকলেও মাঠের সাকিবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বোর্ড। ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে থাকতে হবে। বোর্ডের মতে, ওয়ানডে ফরম্যাটে সাকিবের অভিজ্ঞতা দলকে এই লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করতে পারে। সাকিব নিজেও একাধিকবার দেশের মাটিতে খেলে অবসরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলে নিজের ফিটনেসের প্রমাণও দিচ্ছেন তিনি।
অনিশ্চয়তার মেঘ
বিসিবির সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবতা অনেক কঠিন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে সাকিবের মাথার ওপর ঝুলে থাকা মামলাগুলো কীভাবে প্রত্যাহার হবে, তা নিয়ে কোনো পরিষ্কার রূপরেখা নেই। আইনি সুরক্ষা বা গ্রেপ্তারের ঝুঁকি এড়ানোর নিশ্চয়তা না পেলে সাকিব আদৌ দেশে ফিরবেন কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
ঝিমিয়ে পড়া দেশের ক্রিকেটে সাকিবের ফেরার সংবাদ কিছুটা উত্তেজনা ছড়ালেও, ‘যদি’ এবং ‘কিন্তুর’ পাহাড় ডিঙিয়ে তিনি কবে নাগাদ লাল-সবুজ জার্সিতে মাঠে নামতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে।
Analysis | Habibur Rahman