.
আন্তর্জাতিক

ধ্বংসস্তূপের ওপর ‘দ্বিতীয় দুবাই’ গড়ার স্বপ্ন: গাজা নিয়ে কুশনারের ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবনের উচ্চাভিলাষী ব্লু-প্রিন্ট

Email :17

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৩ সোমবার বসন্তকাল

টানা দুই বছরের ইসরায়েলি আগ্রাসনে যেখানে গাজার ৮০ শতাংশ ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, সেখানেই এবার বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র ও আকাশচুম্বী অট্টালিকা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখালেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর বহুচर्চিত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ বা মহাপরিকল্পনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। কুশনারের ভাষায়, গাজার উন্নয়নের জন্য ‘আমাদের একটি মাস্টারপ্ল্যান আছে এবং এর কোনো বিকল্প বা প্ল্যান-বি নেই।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে গাজা নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করেন তিনিফাইল ছবি

গাজা বদলে ফেলার রূপরেখা: ১৮০টি স্কাইস্ক্র্যাপার ও উপকূলীয় পর্যটন
কুশনারের উপস্থাপনায় গাজার যে ভবিষ্যৎ চিত্র আঁকা হয়েছে, তা অনেকটা পারস্য উপসাগরীয় ধনী শহর দোহা কিংবা দুবাইয়ের আদলে তৈরি। পরিকল্পনায় গাজার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলরেখাকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল ‘উপকূলীয় পর্যটন’ অঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এই এলাকায় প্রায় ১৮০টি গগনচুম্বী ভবন (স্কাইস্ক্র্যাপার) নির্মাণ করা হবে, যার মধ্যে বড় একটি অংশ হবে বিলাসবহুল হোটেল ও আবাসিক টাওয়ার।

উপস্থাপিত মানচিত্রে মিসর সীমান্তের কাছে গাজার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে একটি অত্যাধুনিক সমুদ্রবন্দর এবং সেখান থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে একটি বিমানবন্দরের অবস্থান দেখানো হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত বিমানবন্দরের স্থানটি আজ থেকে দুই দশক আগে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজা বিমানবন্দরের মাত্র কয়েক মাইল উত্তরে অবস্থিত।

‘নিউ রাফা’ ও ‘নিউ গাজা’: নতুন দুটি শহরের জন্ম
কুশনারের এই মেগাপ্রজেক্টের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো দুটি নতুন শহর—‘নিউ রাফা’ এবং ‘নিউ গাজা’।

  1. নিউ রাফা: এই শহরটিকে মূলত আবাসিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পরিকল্পনামাফিক এখানে ১ লাখেরও বেশি স্থায়ী আবাসন ইউনিট তৈরি করা হবে। নাগরিকদের সুবিধার্থে ২০০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৭৫টিরও বেশি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র বা হাসপাতাল নির্মাণের কথা রয়েছে। কুশনারের দাবি, মাত্র দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা সম্ভব। তিনি আরও জানান, গাজার ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
  2. নিউ গাজা: এই শহরটিকে তিনি একটি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব’ বা শিল্পনগরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর মূল লক্ষ্য হবে শতভাগ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং গাজাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা।

কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজ (CGI) ব্যবহার করে কুশনার যে দৃশ্যকল্প তুলে ধরেছেন, তাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার কোনো চিহ্ন নেই; বরং সেখানে দেখা যাচ্ছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর এক জৌলুসপূর্ণ মহানগরী।

শর্ত ও অর্থায়ন: ঝুঁকি বনাম সুযোগ
তবে এই উন্নয়নের চাবি যে শর্তের ওপর ঝুলে আছে, তা হলো হামাসের নিরস্ত্রীকরণ। কুশনার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, হামাস যদি নিরস্ত্র না হয়, তবে গাজাবাসীর এই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন বাস্তবে রূপ নেবে না। ট্রাম্পের ‘গাজা শান্তি পর্যদ’ সনদ স্বাক্ষরের পরপরই এই পরিকল্পনাটি সামনে আনা হয়।

বিশাল এই কর্মযজ্ঞে অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে? এ প্রসঙ্গে কুশনার জানান, প্রাথমিক ধাপে বিভিন্ন দেশের সরকার অর্থায়নে এগিয়ে আসবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে আয়োজিত একটি সম্মেলনে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। একইসঙ্গে তিনি বেসরকারি খাতকে বা ‘প্রাইভেট সেক্টর’কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি জানি এমন জায়গায় বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু আপনারা আস্থা রাখুন। এটি একটি অসাধারণ বিনিয়োগ সুযোগ হতে পারে।’

সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া: উন্নয়ন নাকি অস্তিত্ব বিলীন?
কুশনারের এই চাকচিক্যময় পরিকল্পনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গাজার নতুন টেকনোক্রেটিক কমিটির প্রধান আলী শাত্ বিষয়টিকে সময়ের দাবি হিসেবে দেখলেও, ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে এসেছে তীব্র সমালোচনা। ফিলিস্তিনি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বিষয়টিতে খুব ধীর ও সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।

অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন ‘ইউরো-মেডিটেরানিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর’-এর প্রতিষ্ঠাতা রামি আবদু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি এই পরিকল্পনাকে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব স্বকীয়তা ও ইতিহাস মুছে ফেলার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিনিদের বর্তমান অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তাদের ভূমিতে বাণিজ্যিকীকরণের এই চেষ্টা মূলত এক ধরনের শোষণ।

উল্লেখ্য, এটিই প্রথম নয়; ২০১৯ সালে বাহরাইনে ‘ফ্রম পিস টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক সম্মেলনেও কুশনার গাজা ও পশ্চিম তীরকে কেন্দ্র করে একই ধরনের বাণিজ্যিক ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। এবারের পরিকল্পনা তারই এক বর্ধিত ও আধুনিক সংস্করণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts