১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৮:২৫ সোমবার বসন্তকাল
দীর্ঘ আড়াই যুগ পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (শাকসু) নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে আইনি জটিলতায় থমকে গেছে পুরো প্রক্রিয়া। এই অচলাবস্থা নিরসনে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধির ‘২১ দিনের নিয়ম’ শিথিল করার জোর দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা। এই দাবিতে বুধবার (২১ জানুয়ারি) ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করার পাশাপাশি ২৮টি বিভাগে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা। দাবি আদায় না হলে ক্যাম্পাস পুরোপুরি অচল করে দেওয়ার (কমপ্লিট শাটডাউন) হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন প্রার্থীরা
বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনের পথে বাধা অপসারণের দাবি জানানো হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
সংবাদ সম্মেলনে স্বতন্ত্র সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী ফয়সাল হোসেন আইনি ও যৌক্তিক দিক তুলে ধরে বলেন, ‘এই নির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা তাদের মেধা, শ্রম ও অর্থের সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেছেন। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে চেম্বার জজ আদালতে আপিল করেছে। যেহেতু শাকসু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পূর্বানুমতি রয়েছে, তাই আমাদের আইনি ভিত্তি বেশ শক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের ২১ দিন আগে অন্য কোনো নির্বাচন করা যাবে না—ইসির এই নিয়মটি শাকসু নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিথিল করতে হবে। এটিই এখন আমাদের প্রধান দাবি।’
‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর হুমকি
নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিবির–সমর্থিত প্যানেল ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’-এর ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হাসান কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮টি বিভাগের শিক্ষার্থীরা আমাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেছেন। যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি না করা হয়, তবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে “কমপ্লিট শাটডাউন” কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হব।’
ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ও রাজনৈতিক উত্তাপ
নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে সংবাদ সম্মেলনে। ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী মুজাহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘ভোটের মাত্র দুই দিন আগে ছাত্রদলের ইন্ধনে ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে দুইজন প্রার্থী এবং একজন শিক্ষার্থীকে দিয়ে রিট করানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে যারা এমন ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, আমরা তাদের তীব্র নিন্দা জানাই।’
এ সময় সেখানে ছাত্রদল–সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’-এর ভিপি প্রার্থী মোস্তাকিম বিল্লাহ, স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী পলাশ বখতিয়ারসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, ক্যাম্পাসে নীরবতা
শিক্ষার্থীদের ডাকা বর্জন কর্মসূচির প্রভাবে আজ সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের একাডেমিক ভবনগুলো ছিল কার্যত জনশূন্য। সরেজমিনে দুপুর দুইটার দিকে বিভিন্ন অনুষদ ঘুরে দেখা যায়, কোনো শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান চলছে না। ক্যাম্পাসের পরিবেশ শান্ত থাকলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য।
একাডেমিক অচলাবস্থার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কেমিকৌশল ও পলিমার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সালাতুল ইসলাম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে আমাদের বিভাগে কোনো ক্লাস বা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। দাপ্তরিক কাজ চলমান থাকলেও শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরছে না। দু-একজন শিক্ষার্থী এলেও তারা ব্যক্তিগত কাজে এসেছিল।’
প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ২৮ বছরের অচলায়তন ভেঙে গতকাল মঙ্গলবার শাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত সোমবার হঠাৎ করেই দুইজন প্রার্থী ও একজন শিক্ষার্থীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর চার সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেন। এই খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা।
সোমবার বিকেলেই সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ এবং মঙ্গলবার দিনভর বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। পরবর্তীতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সমাবেশ থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়, যার প্রেক্ষিতে আজ বুধবার সকাল থেকে অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম।
Analysis | Habibur Rahman