১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১২ সোমবার বসন্তকাল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং প্রচ্ছন্ন হুমকির জেরে আর্কটিক অঞ্চলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির আকস্মিক অবনতি হওয়ায় ডেনমার্ক তড়িঘড়ি করে গ্রিনল্যান্ডে তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মৈত্রী এবং ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন ও সামরিক মহড়া
ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ডিআর এবং টিভি-২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যায় ডেনিশ সেনাপ্রধান পিটার বয়সেনের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা কাঙ্গারলুসুয়াকে পৌঁছেছে। নতুন করে পাঠানো এই ৫৮ জন সেনা সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত ৬০ জন ডেনিশ সেনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে এই সম্মিলিত বাহিনী ‘অপারেশন আর্কটিক এনডিউরেন্স’ নামক একটি বহুজাতিক সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মহড়ার নাম দেওয়া হলেও এটি মূলত গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ডেনমার্কের শক্তি প্রদর্শনের একটি কৌশল।
ট্রাম্পের অনড় অবস্থান ও নোবেল বিতর্ক
গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর অবস্থানে অনড়। সম্প্রতি এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ড দখলে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি ‘না’ বলেননি। তিনি ‘কোনো মন্তব্য নেই’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় জল্পনা আরও বেড়েছে।
এরই মধ্যে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গর স্টোরকে পাঠানো এক বার্তায় ট্রাম্প নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। চলতি বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি জানান, তিনি আর তথাকথিত ‘শান্তিবাদী নীতি’ মেনে চলতে বাধ্য নন। তাঁর এই মন্তব্য কূটনৈতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ন্যাটোর অস্তিত্ব সংকট
ট্রাম্পের এই আগ্রাসী মনোভাব আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর মূল ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। ডেনমার্ক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড কোনো পণ্য নয় যে এটি বিক্রি করা হবে। কোপেনহেগেন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, কোনো ধরনের জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগের চেষ্টা করা হলে তা ন্যাটো জোটের চূড়ান্ত অবসান ঘটাবে। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ মানে পুরো জোটের ওপর আক্রমণ—ডেনমার্ক এই নীতি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে গতকাল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে একটি যৌথ ন্যাটো মিশন চালু করার প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে।
বাণিজ্যযুদ্ধের দামামা
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংঘাতের মেঘও ঘনীভূত হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সমঝোতায় না পৌঁছালে ডেনমার্কসহ ইউরোপের আটটি দেশের পণ্যে চড়া শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ট্রেড বাজুকা’ বা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপবিরোধী আইন প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে। এই আইন কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের বড় ধরনের ব্যবসায়িক বাধার মুখে পড়তে হবে।
সুইজারল্যান্ডের দাভোস সম্মেলনে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন মার্কিন কূটনীতিকদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো আঘাত ইউরোপ সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করবে। Analysis | Habibur Rahman
