১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:০২ বুধবার বসন্তকাল
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের একাংশ) আসনে নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তাঁর দাবি, স্থানীয় প্রশাসন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে এবং একই অপরাধের জের ধরে তাকে তিন ধাপে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব অভিযোগ করেন।

প্রশাসনের গোপনীয়তা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
সংবাদ সম্মেলনে রুমিন ফারহানা প্রশাসনের দাপ্তরিক গোপনীয়তা রক্ষা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গত দুই দিনে তার বিরুদ্ধে জারি করা একাধিক সরকারি চিঠি তার কাছে পৌঁছানোর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় থেকে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটিকে দেওয়া একটি চিঠি ১৭ তারিখ রাতেই এবং ১৮ তারিখ সকালে ফেসবুকে ভাইরাল হয়।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “যে প্রশাসন একটি চিঠির গোপনীয়তা দুই ঘণ্টাও রক্ষা করতে পারে না, তারা কীভাবে জাতীয় নির্বাচনের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করবে?” এছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জারি করা কারণ দর্শানোর নোটিশটিও তিনি হাতে পাওয়ার আগেই ফেসবুকে দেখেছেন বলে জানান।
‘এক অপরাধে তিন সাজা’র ব্যাখ্যা
প্রশাসনের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, গত ১৭ জানুয়ারি সরাইলের ইসলামাবাদে তিনি কোনো জনসভা নয়, বরং একটি ছোট উঠান বৈঠক করছিলেন। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত হলে তিনি বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করে নেমে যান। কিন্তু এরপরও তাকে একই ঘটনার জন্য তিনভাবে হেনস্তা করা হয়েছে।
তার ভাষ্যমতে, “প্রথমত, ওই ঘটনার পর আমাকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর আগেও আমাকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। অর্থাৎ আমার অপরাধের শাস্তি হিসেবে অর্থদণ্ড দেওয়া হলো। দ্বিতীয়ত, ইউএনও এ নিয়ে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটিকে চিঠি দিলেন। তৃতীয়ত, রিটার্নিং কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসক আমাকে শোকজ করলেন। একটিমাত্র ঘটনার জন্য তিন জায়গায় শাস্তি দেওয়া হলো। প্রশাসনের এমন পক্ষপাতমূলক আচরণের অধীনে আমি কীভাবে নির্বাচন করব?”
‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ প্রদর্শনের অভিযোগ ও বাস্তবতা
সরকারি চিঠিতে রুমিন ফারহানা ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখিয়েছেন বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “আমি কাউকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইনি। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম যে, অন্য প্রার্থীর কর্মীরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে, অথচ আপনারা তাদের কিছু বলছেন না। প্রশাসন আমার এই কথাটিকে বিকৃত করেছে।” আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রশাসনের সামনে হাবিব সাহেব বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেও সেখানে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে প্রশাসনের নীরবতা
রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং এই আসনে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব নির্বাচনী প্রচারণায় তাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “জুনায়েদ আল হাবিব আমাকে ‘নর্তকী’ ও ‘টিস্যু পেপার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। একজন নারী প্রার্থীর বিরুদ্ধে এমন উসকানিমূলক, আক্রমণাত্মক ও লৈঙ্গিক অবমাননাকর বক্তব্যের পরেও জেলা প্রশাসক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। প্রশাসনের এই নীরবতা তাদের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
আইনি এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে জেলা প্রশাসক তাকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কারণ দর্শানোর যে নোটিশ দিয়েছেন, তার আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই আইনজীবী প্রার্থী। তিনি বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধির ২৬ ধারা অনুযায়ী একটি তদন্ত কমিটি রয়েছে, যেখানে ইউএনও অভিযোগ জানিয়েছেন। এরপরও জেলা প্রশাসক তাকে শোকজ করতে পারেন কি না এবং উপস্থিত না হলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিতে পারেন কি না—বিষয়টি তিনি নির্বাচন কমিশনের বিবেচনার জন্য তুলে ধরেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
রুমিন ফারহানার এসব অভিযোগের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান বলেন, প্রার্থীর এসব অভিযোগ মনগড়া। তিনি বলেন, “নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে যেকোনো প্রার্থীকেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া একটি সাধারণ দাপ্তরিক প্রক্রিয়া। তিনি (রুমিন) তার জবাব দেবেন এবং আমরা তা নির্বাচন কমিশনকে জানাব।”
জেলা প্রশাসক আরও দাবি করেন, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। প্রতিদিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে থেকে আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে বিভিন্ন প্রার্থীকে জরিমানা করছেন এবং অবৈধ মঞ্চ ভেঙে দিচ্ছেন। এসব তথ্য নিয়মিত নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
Analysis | Habibur Rahman