১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল
বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা আলোচিত দ্বীপ ভাসানচর কার—নোয়াখালীর হাতিয়ার, নাকি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের? দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা এই প্রশাসনিক ও আঞ্চলিক রশি টানাটানির অবশেষে অবসান ঘটেছে। ভূমি মন্ত্রণালয় এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, ভাসানচরের বিতর্কিত ছয়টি মৌজা মূলত চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলারই অংশ।

গত ১৩ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো এক নির্দেশনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে সন্দ্বীপ ও হাতিয়াবাসীর মধ্যে চলে আসা দীর্ঘদিনের উত্তেজনার সমাপ্তি ঘটল।
যেভিত্তিতে সন্দ্বীপের হলো ভাসানচর
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি ছিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন। এই কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন, ঐতিহাসিক নথিপত্র পর্যালোচনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেয়। বিশেষ করে ভূ-উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে এবং সিএস (CS) ও আরএস (RS) জরিপের ম্যাপ মিলিয়ে দেখা হয়। বিশ্লেষণের পর কমিটি নিশ্চিত হয় যে, ভাসানচরের ছয়টি মৌজা ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে সন্দ্বীপের সীমানার অন্তর্ভুক্ত।
ন্যায়ামস্তির পুনর্জন্ম ও আবেগের লড়াই
সন্দ্বীপবাসীর কাছে ভাসানচর কেবল একটি জেগে ওঠা চর নয়, বরং হারানো পিতৃভিটা ফিরে পাওয়ার মতো আবেগ। স্থানীয় ও বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ১৯৯২ সালের দিকে সন্দ্বীপের সমৃদ্ধ ইউনিয়ন ‘ন্যায়ামস্তি’ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এর কয়েক বছর পরই ঠিক সেই স্থানে, অর্থাৎ সন্দ্বীপের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দক্ষিণে নতুন করে চর জাগতে শুরু করে।
স্থানীয় জেলেরা একে ‘ঠ্যাঙ্গারচর’ নামে ডাকলেও, পরবর্তীতে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় এর নাম হয় ‘ভাসানচর’। সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের দাবি ছিল, বিলীন হওয়া ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের জায়গাতেই এই চরের উৎপত্তি, তাই এর ন্যায্য মালিকানা সন্দ্বীপের।
সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং ন্যায়ামস্তির সাবেক অধিবাসী দিপটি সওদাগর বলেন, ‘আমার বাড়ি ছিল ন্যায়ামস্তির ৩ নম্বর ওয়ার্ডে। এখন যেখানে ভাসানচরের মাঝবরাবর অবস্থান, সেখানেই ছিল আমাদের ভিটা। ১৯৯৫ সালে আমরা বাধ্য হয়ে সারিকাইতে চলে আসি। চোখের সামনে জেগে ওঠা আমাদের বাপ-দাদার ভিটা অন্য জেলায় চলে যাবে, এটা আমরা মেনে নিতে পারিনি। এখন মালিকানা ফিরে পেয়ে আমরা আনন্দিত।’
বিরোধের ইতিবৃত্ত ও আইনি জটিলতা
বিরোধের সূত্রপাত হয় ২০১৭ সালে, যখন সরকার রোহিঙ্গা স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় ভাসানচরকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার অংশ হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং দিয়ারা জরিপ সম্পন্ন করে। এতে ফুঁসে ওঠে সন্দ্বীপের মানুষ। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেখানে ‘ভাসানচর থানা’ গঠন করে সেটিকে নোয়াখালীর অধীনে ন্যস্ত করে।
সন্দ্বীপের ছাত্র-জনতা ও পেশাজীবীরা এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। মনিরুল হুদা নামের এক ব্যক্তি উচ্চ আদালতে রিট করলে আদালত সীমানা নির্ধারণের নির্দেশ দেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত সেই নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
পটপরিবর্তন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাহী বিভাগ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে তৎপর হয়। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার সীমানা জটিলতা নিরসনে ১৮ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে দুই জেলার জেলা প্রশাসক, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার এবং উভয় উপজেলার পেশাজীবী প্রতিনিধিরা ছিলেন।
গত ৯ মার্চ কমিটির প্রথম সভায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা ঐতিহাসিক দলিল ও ম্যাপ উপস্থাপন করে প্রমাণ করে যে, ভাসানচর সন্দ্বীপেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্প্রতি এনসিপি নেতা ও হাতিয়ার বাসিন্দারা ভাসানচরকে হাতিয়ার অংশ দাবি করে আন্দোলন ও সংবাদ সম্মেলন করলেও, কারিগরি ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে ভূমি মন্ত্রণালয় সন্দ্বীপের পক্ষেই রায় দিয়েছে।
প্রতিক্রিয়া
দীর্ঘদিনের দাবির স্বীকৃতি মেলায় সন্দ্বীপে আনন্দের বন্যা বইছে। এ বিষয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মংচিংনু মারমা বলেন, ‘ভাসানচরের মালিকানা নিয়ে সন্দ্বীপবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশা ছিল। মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের ফলে জনমনে স্বস্তি ফিরেছে এবং দ্বীপের মানুষ অত্যন্ত আনন্দিত।’
এই সিদ্ধান্তের ফলে ভাসানচরের প্রশাসনিক কার্যক্রম এখন থেকে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার অধীনে পরিচালিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
Analysis | Habibur Rahman