.
অন্যান্য

এআই প্রযুক্তির ভয়ঙ্কর রূপ: ঘরের গোপনীয়তা ফাঁস থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে ‘কিলিং মেশিন’

Email :37

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৮:২৭ সোমবার বসন্তকাল

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) বর্তমান বিশ্বে কেবল মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ এখন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা হরণ থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রে যান্ত্রিকভাবে মানুষ হত্যার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্যে উঠে এসেছে এআই-এর এমনই কিছু উদ্বেগজনক ব্যবহারের চিত্র।

দেয়ালের ওপারেও নেই গোপনীয়তা: ওয়াইফাই যখন গুপ্তচর
আপনার ঘরের সাধারণ ওয়াইফাই রাউটারটি কি আপনার ওপর নজরদারি করতে পারে? উত্তরটি আতঙ্কজনক হলেও সত্য। এমআইটি (MIT) এবং কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহার করে ওয়াইফাই রাউটারের অদৃশ্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিকে এখন ক্যামেরার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

এই প্রযুক্তিতে কোনো প্রথাগত ক্যামেরা বা মাইক্রোফোনের প্রয়োজন হয় না। এআই রাউটারের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে দেয়ালের ওপারে থাকা মানুষের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের নড়াচড়া, ঘুমের ভঙ্গি এমনকি নিঃশ্বাসের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এআই এই ফ্রিকোয়েন্সি বা তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে মানুষের অবস্থানের প্রায় শতভাগ নির্ভুল ‘সিলুয়েট’ বা অবয়বের ছবি তৈরি করতে সক্ষম। এর ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি এখন চরম ঝুঁকির মুখে।

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই: ইসরায়েলের ‘গসপেল’ ও ‘ল্যাভেন্ডার’
ব্যক্তিগত নজরদারির বাইরে যুদ্ধক্ষেত্রেও এআই-এর ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক গাজা সংঘাতে ইসরায়েল টার্গেট নির্ধারণে এবং বোমা হামলায় এআই-এর ব্যাপক ব্যবহার করছে, যা বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তুলেছে।

১. ‘গসপেল’ (Gospel) সিস্টেম:
বোমা হামলার জন্য লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেট নির্ধারণে ইসরায়েল ‘গসপেল’ নামক একটি এআই সিস্টেম ব্যবহার করে। এই সিস্টেমটি মূলত চারটি ক্যাটাগরিতে টার্গেট তৈরি করে:

  • সামরিক লক্ষ্যবস্তু (অস্ত্রাগার বা সদর দপ্তর)।
  • মাটির নিচের টানেল।
  • সদস্যদের পারিবারিক বাড়ি।
  • ‘পাওয়ার টার্গেট’ বা বহুতল আবাসিক ভবন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ‘পাওয়ার টার্গেট’ বা আবাসিক ভবনগুলো ধ্বংস করার মূল উদ্দেশ্য সামরিক সুবিধা আদায় নয়, বরং বেসামরিক মানুষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।

২. ‘ল্যাভেন্ডার’ (Lavender) সিস্টেম:
নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যা বা টার্গেট করার জন্য ইসরায়েল ‘ল্যাভেন্ডার’ নামক এআই সিস্টেম ব্যবহার করছে। যুদ্ধের শুরুতে এই সিস্টেমটি প্রায় ৩৭ হাজার সম্ভাব্য সদস্যের একটি তালিকা তৈরি করেছিল। এই এআই প্রোগ্রামটি টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে তার পারিবারিক বাড়ির সাথে সংযুক্ত করে এবং যখন তিনি বাড়িতে অবস্থান করেন, তখন সেখানে হামলার সুপারিশ করে।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এআই দ্বারা নির্ধারিত এই টার্গেটগুলো যাচাই-বাছাইয়ে মানুষের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। অভিযোগ রয়েছে, একজন ব্যক্তি টার্গেট হিসেবে সঠিক কি না, তা যাচাই করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় নেওয়া হতো—মূলত তিনি পুরুষ কি না, কেবল সেটুকুই দেখা হতো।

বেসামরিক মৃত্যুর অনুমোদন ও এআই-এর নিষ্ঠুর গাণিতিক হিসাব
ল্যাভেন্ডার সিস্টেমের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর বিষয়টিকেও একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক ছকে ফেলা হয়েছে। এআই যখন হামাস সদস্যদের বাড়িতে হামলার নির্দেশনা দেয়, তখন সেখানে সাধারণ মানুষের মৃত্যু বা ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ অনুমোদিত ছিল।

তথ্যমতে, একজন জুনিয়র সদস্যকে হত্যার জন্য ১৫ থেকে ২০ জন সাধারণ বেসামরিক মানুষের মৃত্যু অনুমোদনযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হতো। আর সিনিয়র বা উচ্চপদস্থ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা কখনো কখনো ৩০০ জন পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে জানা গেছে। অর্থাৎ, যুদ্ধের ময়দানে এআই এখন নির্ধারণ করছে কতজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু গ্রহণযোগ্য।

আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও ইসরায়েলের অবস্থান
যুদ্ধক্ষেত্রে এআই-এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রোধে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র একটি আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রকাশ করে। বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ এই নীতিমালায় স্বাক্ষর করে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানবিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও, ইসরায়েল এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।

উপসংহার
প্রযুক্তির এই অগ্রগতি আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। একদিকে ওয়াইফাই প্রযুক্তির মাধ্যমে এআই আমাদের শোবার ঘর পর্যন্ত নজরদারি করার ক্ষমতা অর্জন করেছে, অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের বিচার-বিবেচনার পরিবর্তে যন্ত্রের সিদ্ধান্তে হাজারো মানুষের প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এআই এখন কেবল আর সহায়ক শক্তি নয়, বরং এটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ব্যবহৃত হলে মানবতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য এক চরম হুমকি।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts