.
জাতীয়

রাজধানীর উপকণ্ঠে ভোটের হাওয়া: বিএনপি-জামায়াত দ্বৈরথে আবর্তিত ৫ আসন

Email :29

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল

রাজধানী ঢাকার কোলাহল ছাড়িয়ে আশপাশের উপজেলাগুলোতে এখন নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে। ঢাকার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দোহার, নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও ধামরাই—এই পাঁচটি সংসদীয় আসনে আসন্ন নির্বাচনের সমীকরণ বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের দোলাচল শেষে মাঠের চিত্র এখন অনেকটাই স্পষ্ট। ভোটার ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই জনপদগুলোতে মূল লড়াইটা হতে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।

যদিও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং আরও কয়েকটি দলের উপস্থিতি নির্বাচনী মাঠে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তবুও সাধারণ ভোটারের দৃষ্টি প্রধানত ধানের শীষ ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের দিকেই। কোনো কোনো আসনে দলীয় কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যের সুর বাজছে, আবার কোথাও জোটের একক প্রার্থী ও আইনি জটিলতা নিয়ে এখনো কাটেনি ধোঁয়াশা।

ঢাকা-১: একই গ্রামের দুই প্রার্থীর লড়াই
দোহার ও নবাবগঞ্জ নিয়ে গঠিত ঢাকা-১ আসনে ভোটের লড়াইয়ে যোগ হয়েছে আঞ্চলিকতার ভিন্ন আমেজ। এই আসনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী—বিএনপির খন্দকার আবু আশফাক এবং জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম—উভয়ের বাড়িই নবাবগঞ্জের কলাকোপা গ্রামে।

বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবু আশফাক দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর সাবেক এমপি আব্দুল মান্নানের কন্যা মেহনাজ মান্নানের অনুসারীদের মধ্যে সাময়িক ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। তবে গত ২০ ডিসেম্বর এক সভায় মেহনাজ মান্নান প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দেওয়ায় সেই বরফ গলেছে। খন্দকার আবু আশফাক আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন, তরুণ ভোটার ও দলীয় ঐক্যের শক্তিতে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী ও সাবেক ছাত্রশিবির নেতা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এলাকায় ‘ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধ’ এবং পরিবর্তনের ডাক দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরাও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ঢাকা-২: দলবদল ও আইনি লড়াইয়ের নাটকীয়তা
কেরানীগঞ্জ ও সাভারের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-২ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আমানউল্লাহ আমান। তবে নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হককে ঘিরে। ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দল পরিবর্তন করে জামায়াতের টিকিটে মনোনয়ন জমা দেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বাতিল করলেও নির্বাচন কমিশনে আপিল করে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি একে ‘সত্যের জয়’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন।

এলাকার সাধারণ ভোটাররা বলছেন, তারা কেবল পোস্টারসর্বস্ব প্রার্থী চান না; এমন প্রতিনিধি চান যিনি সুখে-দুখে পাঁচ বছর তাদের পাশে থাকবেন।

ঢাকা-৩: অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে সরগরম
কেরানীগঞ্জের একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসনে যাচাই-বাছাইয়ে অনেক প্রার্থী ঝরে পড়লেও মাঠে রয়েছেন আটজন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং জামায়াতের শাহীনুর ইসলামের মধ্যে।

প্রচারণার শুরুতেই জামায়াত প্রার্থী শাহীনুর ইসলাম অভিযোগ করেছেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠী তাদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে এবং কর্মীদের বাধা দিচ্ছে। তবে এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নিপুণ রায়। তিনি দাবি করেন, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াই করা বিএনপি কখনোই প্রতিপক্ষের এজেন্টের ওপর হামলা বা হয়রানির রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়।

ঢাকা-১৯: জোটের প্রার্থী নিয়ে ধোঁয়াশা
সাভার এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৯ আসনে বিএনপির একক আধিপত্য বজায় রাখতে কাজ করছেন সাবেক এমপি দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বী আইয়ুব খান মনোনয়ন জমা না দেওয়ায় তিনি বেশ নির্ভার।

তবে এই আসনে জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপির সমীকরণ নিয়ে জল্পনা রয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি মো. আফজাল হোসাইন যেমন পরিবর্তনের ডাক দিয়ে মাঠে আছেন, তেমনি এনসিপির দিলশানা পারুল নিজেকে জোটের প্রার্থী হিসেবে দাবি করছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মেনে নেবেন তিনি। এই আসনে মোট ৯ জন বৈধ প্রার্থীর মধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থীরাও রয়েছেন।

ঢাকা-২০: বিদ্রোহ মিটিয়ে জয়ের আশায় প্রার্থীরা
ধামরাই উপজেলার ঢাকা-২০ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন উপজেলা সভাপতি মো. তমিজ উদ্দিন। এখানে দলীয় অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ানোয় বিএনপির ঘরোয়া বিবাদ অনেকটাই কমেছে। তমিজ উদ্দিন মনে করেন, বিগত দিনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার শক্ত অবস্থানের কারণে ভোটাররা তাকেই বেছে নেবেন।

অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী মো. আবদুর রউফ এবং এনসিপির নাবিলা তাসনিদ মাঠে রয়েছেন। এনসিপির প্রার্থী নাবিলা তাসনিদকে নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে শুরুতে ক্ষোভ ও তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করার ঘটনা ঘটলেও, তিনি দাবি করেছেন সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে।

সার্বিক পর্যবেক্ষণ
রাজধানী লাগোয়া এই পাঁচটি আসনে প্রার্থীদের ব্যক্তি ইমেজ, দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং বিগত দিনের ভূমিকা ভোটারদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মনোভাব এবং জোটের শেষ মুহূর্তের সমীকরণ ভোটের ফলাফলে বড় চমক নিয়ে আসতে পারে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts