.
আন্তর্জাতিক

নজিরবিহীন নজরদারি: কাশ্মীরের মসজিদে ইমামদের পাসপোর্ট থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট—সব তথ্য তলব পুলিশের

Email :26

১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:০৭ বুধবার বসন্তকাল

জম্মু ও কাশ্মীরের ইতিহাসে এর আগে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। উপত্যকার মসজিদগুলোর ওপর এবার পুলিশি নজরদারি এক অন্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেবল মসজিদের কাঠামো বা ইতিহাস নয়, এবার ইমাম ও মসজিদ কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। প্রশাসনের এই অতি-তৎপরতায় উপত্যকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা এই পদক্ষেপকে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন।

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের মানচিত্র

কী কী তথ্য চাইছে পুলিশ?
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন মসজিদ কমিটিগুলোর কাছে একটি দীর্ঘ ফর্ম পাঠিয়েছে। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে মসজিদের খুঁটিনাটি। কবে মসজিদটি তৈরি হয়েছে, নির্মাণের খরচ কত ছিল, সেই অর্থের জোগানদাতা কারা—সবই জানাতে হবে প্রশাসনকে। তবে বিষয়টি কেবল মসজিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মসজিদ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং ইমামদের ব্যক্তিগত জীবনের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তাঁদের পাসপোর্ট নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত বিবরণ, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য এবং তাঁদের সামগ্রিক আর্থিক ক্ষমতার খতিয়ান। পুলিশের এই ‘আক্রমণাত্মক তথ্য সংগ্রহ’ অভিযানকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া
পুলিশের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে কাশ্মীরের প্রধান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। মিরওয়াইজ উমর ফারুকের নেতৃত্বাধীন ‘মুত্তাহিদা মজলিস উলেমা’ (এমএমইউ) এই প্রক্রিয়াকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, নির্বাচিত সরকারের উচিত এখনই এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা এবং উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা।

অন্যদিকে, ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আগা রুহুল্লাহ মেহেদি এই ঘটনার পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত উদ্দেশ্য দেখছেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে দেশ যে দক্ষিণপন্থী মতাদর্শে চলছে, তারা এখন ধর্মকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। যারা তাদের মতের সঙ্গে একমত নয়, তাদের দমানোর কৌশল এটি।” তাঁর আশঙ্কা, এই প্রবণতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে হয়তো আরএসএস বা বিজেপি ঠিক করে দেবে শুক্রবারের জুম্মার নামাজে ইমাম সাহেব কী বয়ান দেবেন।

‘নিরাপত্তা নয়, উদ্দেশ্য ভীতি প্রদর্শন’
কারাবন্দী অবস্থাতেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ইঞ্জিনিয়ার রশিদের দল ‘আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টি’ (এআইপি)-ও এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছে। দলের প্রধান মুখপাত্র ইনাম উন নবি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সব তথ্য রয়েছে। নতুন করে এই ব্যক্তিগত তথ্য তলব করার মানে হলো ধর্মাচরণকে নজরবন্দি করা এবং সাধারণ মানুষকে মানসিকভাবে চাপে রাখা। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রশাসন যদি প্রতিটি ধর্মীয় স্থানকে বিপদের উৎস বা ‘থ্রেট’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে, তবে মানুষের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।

প্রশাসনিক সমীকরণ ও পুলিশের নীরবতা
জম্মু ও কাশ্মীর বর্তমানে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ায় পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি অর্থাৎ উপরাজ্যপালের হাতে। সেখানে নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ সত্ত্বেও পুলিশের এই অভিযান বন্ধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই আদেশের কথা স্বীকার না করলেও, অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে গত কয়েক দিন ধরেই মসজিদগুলোতে এই তথ্য সংগ্রহের ফর্ম পাঠানো হচ্ছে। এই ঘটনায় উপত্যকার সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের অবিশ্বাস আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts