১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সন্ধ্যা ৭:২৯ সোমবার বসন্তকাল
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক দুঃসাহসিক সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে এনেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। শনিবার ভোরের এই ঘটনার পর মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়েছে। এই অভিযানের সফলতার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশেষ অভিনন্দন জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে ভিনদেশে এমন আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ।

ছবি: এএফপি
ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর অভিনন্দন
মাদুরোকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ট্যাগ করে এই অভিযানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। নেতানিয়াহু লেখেন, “স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে এমন সাহসী ও ঐতিহাসিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন। আপনার দৃঢ় সংকল্প এবং আপনার সাহসী সেনাদের দুর্দান্ত পদক্ষেপকে আমি স্যালুট জানাই।”
দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল এই অভিযান
রয়টার্স ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মাদুরোকে তুলে আনার এই ঘটনা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জটিল এক সামরিক পরিকল্পনা। ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘কোর টিম’ গত কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত গোপনে এই অভিযানের ছক কষছিলেন। তাঁরা নিয়মিতভাবে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করতেন এবং পরিকল্পনার আপডেট দিতেন।
অভিযানটি পরিচালনা করে মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ডেল্টা ফোর্স। অভিযানের আগে মাদুরোর ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ বাসভবনের হুবহু একটি প্রতিকৃতি তৈরি করে সেখানে প্রবেশের পুঙ্খানুপুঙ্খ মহড়া চালিয়েছিল মার্কিন সেনারা।
সিআইএর ভূমিকা ও ‘ঘরের শত্রু’
এই অভিযানের সফলতার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর। জানা গেছে, গত আগস্ট মাস থেকেই সিআইএর একটি ছোট দল গোপনে ভেনেজুয়েলায় অবস্থান করে মাদুরোর জীবনযাত্রার ধরন পর্যবেক্ষণ করছিল। তবে সবচেয়ে বড় সহায়তাটি আসে মাদুরোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির কাছ থেকে। সিআইএর ‘অ্যাসেট’ বা তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করা ওই ব্যক্তি মাদুরোর প্রতিটি গতিবিধি নজরে রাখছিলেন এবং অভিযানের সময় মাদুরোর সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করেন।
মাদুরোর বর্তমান অবস্থান ও আইনি প্রক্রিয়া
কারাকাস থেকে তুলে আনার পর প্রায় ২ হাজার ১০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়েছে। বিবিসির তথ্যমতে, তাঁকে বর্তমানে নিউইয়র্কের একটি কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত আটক কেন্দ্রে (এমডিসি) রাখা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে মাদক ও অস্ত্র মামলায় আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে ভেনেজুয়েলার এই সমাজতান্ত্রিক নেতাকে। অভিযানের সময় মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও সঙ্গে আনা হয়, তবে তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ
অন্য একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সামরিক অভিযান চালিয়ে তুলে আনার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শনিবার ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের সামনে, নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং লাস ভেগাসের মতো বড় শহরগুলোতে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।
বিক্ষোভকারীদের হাতে দেখা গেছে যুদ্ধবিরোধী বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড। টাইমস স্কয়ারে আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল ‘নো ব্লাড, নো অয়েল’ (রক্ত নয়, তেল নয়) লেখা প্ল্যাকার্ড। ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে ‘ট্রাম্প একজন যুদ্ধাপরাধী’ লেখা পোস্টার প্রদর্শন করেন। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প একে ‘দুঃসাহসিক অভিযান’ বলে আখ্যা দিলেও, সমালোচকরা একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন।
Analysis | Habibur Rahman