১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৪৯ সোমবার বসন্তকাল
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় নাটকীয় এক সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে আটক করেছে মার্কিন বাহিনী। শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানী কারাকাসে ‘বড় পরিসরে’ এই হামলা চালানো হয়। অভিযানের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদুরোকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কারাকাসে ভোরের আতঙ্ক ও বিস্ফোরণ
শনিবার ভোররাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস আচমকা যুদ্ধবিমান ও বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে অন্তত সাতটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শহরের দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা—কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘লা কারলোটা’ সামরিক বিমানঘাঁটি এবং ‘ফুয়ের্তে তিউনা’ সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পর ঘন কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ফুয়ের্তে তিউনা ঘাঁটিতেই প্রেসিডেন্ট মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছিলেন।
হামলার তীব্রতায় কারাকাসের দক্ষিণাংশের একটি বড় সামরিক ঘাঁটির সংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কারমেন হিদালগো (২১) নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “বিস্ফোরণের তীব্রতায় পুরো মাটি কেঁপে উঠছিল। আমরা দূর থেকে যুদ্ধবিমানের গর্জন আর বিস্ফোরণের শব্দ পাচ্ছিলাম। ভয়ে মানুষজন রাস্তায় বেরিয়ে আসে। এটি ছিল এক ভয়াবহ পরিস্থিতি।”
ট্রাম্পের ঘোষণা ও পুরস্কারের প্রসঙ্গ
অভিযানের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ও বড় পরিসরের হামলা। তবে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ঠিক কীভাবে আটক করা হয়েছে বা তাঁদের বর্তমানে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।
উল্লেখ্য, এই অভিযানের আগেই মাদুরোকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তথ্য প্রদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৫ কোটি ডলারের বিশাল অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রকাশ্যে মাদুরোকে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছিলেন। গত সোমবারও তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, ক্ষমতা ত্যাগ করাই হবে মাদুরোর জন্য ‘বুদ্ধিমানের কাজ’।
কলম্বিয়ার প্রতিক্রিয়া ও জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা
প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে ভেনেজুয়েলার ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেন, “এই মুহূর্তে কারাকাসে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।” উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি অবিলম্বে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
পটভূমি ও পেন্টাগনের নীরবতা
ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটকের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। অন্যদিকে, কারাকাসের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি ওই অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি, যুদ্ধজাহাজ এবং উন্নত ফাইটার জেট মোতায়েনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন অভিযোগ করে আসছে যে, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর জেরে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেলের ওপর কঠোর ‘অবরোধ’ আরোপ করা হয় এবং ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশটির নৌযানগুলোতে মার্কিন বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছিল। যদিও মাদুরো সরকার বরাবরই মাদক পাচারের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মহল ‘বিচারবহির্ভূত’ কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
Analysis | Habibur Rahman
