২১শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৬ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৬ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:১৪ শুক্রবার বসন্তকাল
২০১১ সাল। বৈদ্যুতিক গাড়ির দুনিয়ায় তখন একচ্ছত্র আধিপত্যের স্বপ্ন দেখছেন ইলন মাস্ক। এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল চীনের অটোমোবাইল কোম্পানি ‘বিওয়াইডি’ (BYD) সম্পর্কে। সেদিন বিওয়াইডি কি টেসলার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে—এমন প্রশ্নে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিলেন মাস্ক; সম্ভাবনাটি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
মহাকালের চাকা ঘুরে সেই উপহাস আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ১৪ বছর পর, ২০২৫ সালের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্ববাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) বিক্রিতে মার্কিন জায়ান্ট টেসলাকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে একসময় মাস্কের অবজ্ঞার শিকার সেই চীনা কোম্পানি বিওয়াইডি।
পরিসংখ্যানের লড়াইয়ে বিওয়াইডির জয়
২০২৫ সালে গাড়ি বিক্রির যে খতিয়ান প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যায় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে এক বিশাল রদবদল ঘটেছে। সদ্য সমাপ্ত বছরে বিওয়াইডি বিশ্বজুড়ে মোট ২২ লাখ ৬০ হাজার পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক গাড়ি (ব্যাটারি ইভি) বিক্রি করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় তাদের এই বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখছে ইলন মাস্কের টেসলা। ২০২৪ সালের পর টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ২০২৫ সালেও কোম্পানিটির গাড়ি বিক্রি কমেছে। তথ্যানুযায়ী, গত বছর টেসলা মাত্র ১৬ লাখ গাড়ি বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ কম। টেসলার ইতিহাসে এক বছরে বিক্রি কমার এত বড় নজির আর নেই।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিওয়াইডি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের গাড়ি বিক্রি শুরু করেনি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছাড়া টেসলার আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে। মার্কিন বাজারে অনুপস্থিত থেকেও বিশ্বমঞ্চে টেসলাকে হারিয়ে দেওয়া বিওয়াইডির জন্য এক অনন্য মাইলফলক।
টেসলার কেন এই পতন?
একসময় বছরে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা টেসলার এই হঠাৎ পতনের পেছনে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ড।
২০২৫ সালের শুরু থেকেই মাস্ক তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’-এর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তার এই রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর ফলাফল হিসেবে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শহরে টেসলার শোরুমের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং গাড়ি ও স্থাপনা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিক্রির ওপর।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে (চতুর্থ প্রান্তিক) টেসলার গাড়ি বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ কম। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইভি বিক্রির সামগ্রিক দুর্বল চিত্র এবং জনরোষের কারণেই টেসলার এই দুর্দশা।
বিওয়াইডির সাফল্যের চাবিকাঠি
বিওয়াইডির এই অভাবনীয় উত্থানের মূলমন্ত্র হলো—সাশ্রয়ী মূল্য এবং উন্নত প্রযুক্তির সংমিশ্রণ। টেসলার তুলনায় অনেক কম দামে আধুনিক ফিচারের গাড়ি অফার করায় গ্রাহকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে শেনঝেনভিত্তিক এই কোম্পানিটি।
তবে বিওয়াইডির পথচলাও পুরোপুরি মসৃণ নয়। বিশ্ববাজারে কম দামে গাড়ি ছেড়ে দেওয়ায় তাদের ওপর বিভিন্ন দেশের নজরদারি বেড়েছে এবং নতুন করে শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবুও, দেশের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে কোম্পানিটি এখন বিদেশি বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতার বাজার
যদিও বিওয়াইডি টেসলাকে হারিয়েছে, তবুও তাদের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে। ইভি এবং হাইব্রিড মিলিয়ে গত বছর কোম্পানিটি ৪৬ লাখের বেশি গাড়ি বিক্রি করলেও, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটাই ছিল তাদের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির হার।
এর মূল কারণ চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা। এইচএসবিসির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে চীনে প্রায় ১৫০টি গাড়ির ব্র্যান্ড এবং ৫০টিরও বেশি ইভি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইভি নির্মাতা ‘জিলি’, দ্রুত বর্ধনশীল ‘লিপমোটর’ এবং ২০২৪ সালে বাজারে আসা প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘শাওমি’র গাড়ির কারণে বিওয়াইডিকে নিজের ঘরেই কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালটি অটোমোবাইল শিল্পের ইতিহাসে একটি বাঁকবদলকারী বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যেখানে ১৪ বছর আগের এক উপহাসের জবাব দিয়ে বিওয়াইডি প্রমাণ করল—ভবিষ্যতের রাস্তায় তাদের গতিই এখন সবচেয়ে বেশি।
Analysis | Habibur Rahman
