.
আন্তর্জাতিক

মিয়ানমারের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমানের গর্জন

Email :31

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১২:১০ সোমবার বসন্তকাল

দীর্ঘ বিরতির পর আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি। শনিবার দিবাগত রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা ও ভারী গোলাবর্ষণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত। ওপারে চলা যুদ্ধের ভয়াবহতায় নির্ঘুম ও আতঙ্কিত রাত পার করেছেন সীমান্তের অন্তত তিনটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ।

মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরাফাইল ছবি: রয়টার্স

শনিবার রাত ১১টা থেকে রোববার ভোররাত ৩টা পর্যন্ত থেমে থেমে চলা এই বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমান্তবর্তী ঘরবাড়িগুলো থরথর করে কেঁপে ওঠে। তবে স্বস্তির খবর হলো, এবার বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনো গোলা বা বিস্ফোরক পড়ার খবর পাওয়া যায়নি।

রাতভর যা ঘটেছে সীমান্তে
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের তথ্যমতে, শনিবার রাতে হঠাৎ করেই রাখাইনের আকাশে যুদ্ধবিমানের আনাগোনা বেড়ে যায়। এরপরই শুরু হয় মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ। বিশেষ করে টেকনাফের হোয়াইক্যং, উখিয়ার পালংখালী ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে বিকট শব্দ শোনা যায়।

টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা জানান, রাত ১১টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে মাটি কেঁপে ওঠে। ভোররাত ৩টা পর্যন্ত থেমে থেমে মর্টারশেল ও বোমার আওয়াজ ভেসে আসে। সীমান্তের বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পাননি।

একই চিত্র ছিল উখিয়ার রহমতের বিল গ্রামেও। স্থানীয় ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিনের মতে, বিস্ফোরণের শব্দে মনে হচ্ছিল যুদ্ধ খুব কাছেই চলছে। তিনি বলেন, “পুরো এলাকা কেঁপে উঠছিল, আমরা আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি।”

লক্ষ্যবস্তু যখন আরাকান আর্মি
সীমান্তের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থান লক্ষ্য করে শনিবার রাতে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায় মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী (জান্তা)। আরাকান আর্মিও পাল্টা জবাব দেয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো লাইন থেকে আনুমানিক ১৩ কিলোমিটার ভেতরে এবং সীমান্ত পিলার বিআরএম-১৮ থেকে ১৫ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে রাখাইন রাজ্যের ‘বলিবাজার’ এলাকায় এই সংঘাত হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, বলিবাজার এলাকায় আরাকান আর্মির শক্ত ঘাঁটি বা সদর দপ্তর রয়েছে। রাতে বিস্ফোরণের সময় আগুনের ঝলকানি টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত থেকেও দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

ভোটের মধ্যেই যুদ্ধের দামামা
মিয়ানমারে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর যখন জান্তা সরকারের অধীনে ভোট গ্রহণ চলছে, ঠিক সেই সময়েই রাখাইন রাজ্যে নতুন করে এই সংঘাতের তীব্রতা দেখা গেল। শুধু জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মি নয়, সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনে সক্রিয় আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরআরএসও এবং নবী হোসেন বাহিনীর মতো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

এর আগে গত ১৩ ও ১৭ ডিসেম্বর রাতেও সীমান্তের ওপার থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। তখন বেশ কয়েকটি গুলি বাংলাদেশি কৃষকদের ঘরবাড়ি ও মাছের ঘেরে এসে পড়েছিল, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ভীতির সঞ্চার করেছিল।

বিজিবি’র সতর্ক অবস্থান
সীমান্তের ওপারে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

এ বিষয়ে উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জসীম উদ্দিন বলেন, “হোয়াইক্যং বিওপি সংলগ্ন মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আমরাও বিস্ফোরণের শব্দ পেয়েছি। তবে আমাদের ভূখণ্ডের ভেতরে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নাফ নদী ও স্থল সীমান্তে বিজিবি সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রেখেছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।”

রোববার সকাল থেকে শব্দের তীব্রতা কিছুটা কমলেও, সীমান্তের সাধারণ মানুষের মনে এখনো ভয় কাটেনি। টেকনাফের উলুবনিয়া, খারাংখালী, লম্বাবিল থেকে শুরু করে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু, পাথরকাটা ও চাকমা পাড়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সীমান্ত জনপদে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts