১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি রাত ৯:৩৪ সোমবার বসন্তকাল
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে টাকার খেলা বা ‘কালো টাকার প্রভাব’ একটি পুরনো বিতর্ক। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অর্থায়নের এক ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীরা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য অর্থ সহায়তা চাইছেন এবং তাতে বিপুল সাড়াও মিলছে। পশ্চিমা বিশ্বে প্রচলিত এই পদ্ধতিটিকে বলা হচ্ছে ‘ক্রাউডফান্ডিং’ বা গণতহবিল। তবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময়সীমা শুরুর আগেই টাকা তোলার এই প্রক্রিয়া নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

ক্রাউডফান্ডিং: রাজনীতিতে সাধারণের অংশীদারিত্ব
সহজ কথায়, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে অল্প অল্প করে অর্থ সংগ্রহ করাই হলো ক্রাউডফান্ডিং। ইনভেস্টোপিডিয়ার মতে, এটি মূলত ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদানের মাধ্যমে বড় তহবিল গঠনের একটি আধুনিক প্রক্রিয়া।
ঐতিহাসিকভাবে এর শিকড় বেশ গভীর। ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে মহাত্মা গান্ধী ‘তিলক স্বরাজ তহবিল’ গঠনের মাধ্যমে গণমানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। তবে আধুনিক ডিজিটাল ক্রাউডফান্ডিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ‘ম্যারিলিওন’-এর হাত ধরে। আর ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার পর ব্যাংক ঋণ যখন দুর্লভ হয়ে পড়ে, তখন এই পদ্ধতিটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
রাজনীতিতে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মূল দর্শন হলো—বড় কোনো ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি না হয়ে সরাসরি জনগণের টাকায় নির্বাচন করা। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় বাধ্য থাকেন না। মার্কিন নির্বাচনে বারাক ওবামা থেকে শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের আম আদমি পার্টি বা কংগ্রেস—সবাই এই পদ্ধতির সদ্ব্যবহার করেছেন। ২০১৬ সালে ট্রাম্প তাঁর তহবিলের ৬৯ শতাংশই সংগ্রহ করেছিলেন সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র অনুদান থেকে।
বাংলাদেশে নতুন দিনের সূচনা
বাংলাদেশে এতদিন নির্বাচনী ব্যয় মানেই ছিল বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর গোপন অনুদান বা প্রার্থীদের নিজস্ব বিত্তবৈভব। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তরুণ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সেই প্রথা ভাঙতে চাইছেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে তাঁরা স্বচ্ছতার সাথে টাকা তুলছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী তাসনিম জারা সম্প্রতি ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী হিসেবে ফেসবুকে তহবিল সংগ্রহের ডাক দেন। অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র ২৯ ঘণ্টায় তিনি ৪৭ লাখ টাকার তহবিল সংগ্রহ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ডিজিটাল রসিদ শেয়ার করে গর্বের সাথে লিখছেন, “জীবনে প্রথম কোনো দলকে নয়, ব্যক্তিকে টাকা দিলাম।” প্রার্থীরা বলছেন, যাদের টাকা আছে তারাই কেবল নীতিনির্ধারক হবেন—এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি।
আচরণবিধির লঙ্ঘন নাকি প্রচারণার কৌশল?
ক্রাউডফান্ডিং ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও এর আইনি দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’-এর বিধি ১৮ অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের ৩ সপ্তাহ আগে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।
প্রশ্ন উঠেছে, প্রার্থীরা যখন ফেসবুকে ভিডিও বা পোস্ট দিয়ে টাকা চাইছেন, তখন তাঁরা নিজেদের এজেন্ডা ও প্রার্থিতার কথাও তুলে ধরছেন। এটি কি এক প্রকার আগাম প্রচারণা নয়?
এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী জানান, বাংলাদেশে এটি একদমই নতুন ধারণা। যেহেতু আইনে সরাসরি ক্রাউডফান্ডিং নিয়ে কিছু বলা নেই, তাই নির্বাচন কমিশনের উচিত এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া। তবে কৌশলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদ্যমান আইনে একে সরাসরি বাধা দেওয়ার সুযোগ কম। তবে প্রচারণার নির্ধারিত সময়ের আগে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে জনসম্মুখে তুলে ধরাটা আচরণবিধির ধূসর এলাকার মধ্যে পড়ে।
স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ ও আইনি বাধ্যবাধকতা
ক্রাউডফান্ডিং কেবল টাকা তোলাই নয়, এর ব্যয়ের স্বচ্ছতাও অত্যন্ত জরুরি। যুক্তরাজ্যের নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইন অনুযায়ী, গণতহবিলের উদ্দেশ্য এবং প্রাপক সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর অনুচ্ছেদ ৪৪ অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা নির্ধারণ করা আছে। এছাড়া প্রার্থীকে তাঁর সম্ভাব্য আয়ের উৎস এবং প্রাপ্ত অনুদানের সঠিক তথ্য নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হয়।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কালো টাকার প্রভাবমুক্ত করতে ক্রাউডফান্ডিং একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে যারা টাকা তুলছেন, তাদের আয়-ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। স্বচ্ছতা না থাকলে এই মহৎ উদ্যোগটিও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।”
পরিশেষে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রাউডফান্ডিং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি যেমন সাধারণ মানুষকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি নির্বাচনী আইনের আধুনিকায়ন ও স্বচ্ছতার দাবিকেও জোরালো করে তুলেছে।
Analysis | Habibur Rahman