১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:২৩ বুধবার বসন্তকাল
আফ্রিকার সংঘাতময় দেশ সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়ে আর ফেরা হলো না বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বীর সেনানী শামীম রেজার। সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় শহীদ এই বীর সন্তানের শেষ ঠিকানা হলো রাজবাড়ীর কালুখালীর নিজ গ্রামের মাটিতে। রোববার বিকেলে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। শামীমের বিদায়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো মৃগী ইউনিয়ন; স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে সেখানকার বাতাস।
হেলিকপ্টারে নিথর দেহ, কান্নায় ভেঙে পড়ে এলাকাবাসী
রোববার দুপুর পৌনে ২টার দিকে শহীদ শামীমের মরদেহ বহনকারী সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার কালুখালী মিনি স্টেডিয়ামে অবতরণ করে। সেখান থেকে লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যানে করে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গি গ্রামে। যেই ছেলে ছুটিতে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতেন, আজ তিনি ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে। নিজ বাড়িতে মরদেহ পৌঁছানোর পর সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মা, আর মাত্র দেড় বছর আগে বিয়ে করা স্ত্রীর আহাজারিতে উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখ ভিজে ওঠে।
স্বজন ও এলাকাবাসীর শেষ দেখার জন্য মরদেহটি বাড়ির আঙিনায় প্রায় আধাঘণ্টা রাখা হয়। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টায় জানাজা শেষে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। বিউগলে করুণ সুর বাজিয়ে এবং যথাযথ সামরিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
অপূর্ণই রয়ে গেল শামীমের সব স্বপ্ন
কৃষক বাবা আলম ফকিরের বড় ছেলে শামীম রেজা ছিলেন পরিবারের মূল ভরসা। ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া শামীম গত ৭ নভেম্বর সুদানে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় কাঁধে ছিল অনেক দায়িত্ব।
শোকাতুর বাবা আলম ফকির জানান, মেজ ছেলে সোহেল ফকিরকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন শামীম। স্বপ্ন ছিল ছোট ভাই সোহানকেও সিঙ্গাপুরে পাঠাবেন, যার জন্য পাসপোর্টও তৈরি করা হয়েছিল। আর একমাত্র বোন মরিয়ম খাতুন, যে মাদ্রাসায় পড়ে, তার জন্য মিশন শেষে দেশে ফেরার সময় স্বর্ণের গহনা নিয়ে আসার কথা ছিল শামীমের। কিন্তু এক ড্রোন হামলা নিমিষেই চুরমার করে দিল সব স্বপ্ন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা বলেন, “শুক্রবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভিডিও কলে শেষবার কথা হয়েছিল। ছেলে বলেছিল, ‘আব্বু ডিউটিতে যাবো, দোয়া করো।’ সে আর ফিরল না। আল্লাহ যেন আমার ছেলেকে জান্নাতবাসী করেন।”
হামলার প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, গত ১৩ ডিসেম্বর সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কাদুগলি লজিস্টিকস বেইসে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালায়। এতে দায়িত্বরত অবস্থায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী শহীদ হন, যাদের মধ্যে শামীম রেজা একজন। ওই হামলায় আরও নয়জন শান্তিরক্ষী আহত হন, যাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কেনিয়ার নাইরোবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
দেশের তরে এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় জীবন দেওয়া এই বীর সেনানির আত্মত্যাগ গর্বের সাথে মনে রাখবে এলাকাবাসী ও দেশবাসী।
Analysis | Habibur Rahman
