১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:২০ সোমবার বসন্তকাল
এক সময় তিনি ছিলেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর অত্যন্ত আস্থাভাজন ‘সোর্স’। লাতিন আমেরিকার গোপন খবর ওয়াশিংটনে পাচার করাই ছিল তার কাজ। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই ব্যক্তিটিই একসময় হয়ে উঠলেন যুক্তরাষ্ট্রের চোখের বালি। ১৯৮৯ সালের এক শীতের রাতে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায় নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। তিনি পানামার তৎকালীন স্বৈরশাসক জেনারেল ম্যানুয়েল আন্তনিও নরিয়েগা। ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ নামের সেই অভিযানের পর নরিয়েগাকে বাগে আনতে মার্কিন বাহিনী যে অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করেছিল, তা ইতিহাসের পাতায় এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে আছে।

ছবি: এএফপি
মিত্র থেকে শত্রু: সংঘাতের প্রেক্ষাপট
সত্তরের দশকে নরিয়েগার উত্থান ঘটে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের হাত ধরেই। পানামা এবং মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর (যেমন এল সালভাদর ও নিকারাগুয়া) ভেতরের খবর পেতে সিআইএ নরিয়েগাকে নিয়মিত অর্থ প্রদান করত। ওয়াশিংটনের সুনজরে থেকে তিনি পানামার সামরিক গোয়েন্দা প্রধান এবং পরবর্তীতে সেনাপ্রধান হন।
তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে চিত্রটা বদলাতে শুরু করে। ক্ষমতার দম্ভে নরিয়েগা জড়িয়ে পড়েন কলম্বিয়ার কুখ্যাত মাদক কারবারিদের সাথে। পানামাকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচার এবং অবৈধ অর্থ বৈধ করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ১৯৮৫ সালে পানামার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলা আরদিতো বারলেত্তাকে সরিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। পানামা খাল চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দেশটিতে গণতন্ত্র ফেরানোর চাপ থাকলেও নরিয়েগা তা উপেক্ষা করেন।
ধৈর্যের বাঁধ ভাঙা সেই ঘটনা
১৯৮৯ সালের শেষের দিকে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। ১৫ ডিসেম্বর নরিয়েগা নিজেকে পানামার ‘সর্বোচ্চ নেতা’ ঘোষণা করেন এবং দম্ভভরে বলেন, পানামা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। এর ঠিক পরদিন, ১৬ ডিসেম্বর রাতে পানামা ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) চেকপোস্টে এক মার্কিন মেরিন সেনাকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং অন্য এক সেনার স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করা হয়।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ একে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে গণ্য করেন। তিনি উপদেষ্টাদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর পানামায় সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন জাস্ট কজ’।
পানামা সিটিতে আগুনের রাত
১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১টা। হঠাৎ করেই পানামার আকাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জনে। সি-১৩০ হারকিউলিস এবং এফ-১১৭ স্টেলথ ফাইটার থেকে শুরু করে প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান এই অভিযানে অংশ নেয়। পানামায় আগে থেকেই অবস্থানরত ১৩ হাজার মার্কিন সেনার সাথে যোগ দিতে প্যারাস্যুট দিয়ে আকাশ থেকে নামানো হয় আরও হাজার হাজার সৈন্য। সব মিলিয়ে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন সেনার বিশাল বহর পানামা সিটি ঘিরে ফেলে।
পানামার সামরিক বাহিনী বা পিডিএফ-এর প্রতিরোধ ছিল নামমাত্র। নরিয়েগার অনুগত ‘ডিগনিটি ব্যাটালিয়ন’ নামের মিলিশিয়া বাহিনী মার্কিনদের ঠেকানোর বদলে শহরজুড়ে লুটতরাজ ও ত্রাস সৃষ্টিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মার্কিন হামলায় পানামা সিটির বহু ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, নিহত হন কয়েকশ পানামাবাসী ও সেনা।
দূতাবাস ঘেরাও ও ‘রক মিউজিক’ কৌশল
অভিযানের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে জেনারেল নরিয়েগা ছদ্মবেশ ধারণ করে পালিয়ে যান। তিনি আশ্রয় নেন পানামা সিটিতে অবস্থিত ভ্যাটিকানের কূটনৈতিক মিশনে (নানসিয়াচার)। যেহেতু এটি বিদেশি কূটনৈতিক এলাকা, তাই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মার্কিন সেনারা সেখানে জোর করে প্রবেশ করতে পারছিল না।
নরিয়েগাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে মার্কিন বাহিনী তখন এক অভিনব মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের আশ্রয় নেয়। তারা ভ্যাটিকান মিশনের চারপাশ ঘিরে ফেলে এবং মিশনের দিকে মুখ করে বড় বড় লাউডস্পিকার স্থাপন করে। এরপর শুরু হয় উচ্চ শব্দে গান বাজানো।
টানা ১১ দিন, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বিরামহীনভাবে বাজানো হতে থাকে ‘ভ্যান হ্যালেন’, ‘দ্য ক্ল্যাস’ এবং ‘ইউ২’-এর মতো ব্যান্ডের হার্ড রক ও হেভি মেটাল গান। গানের তীব্র শব্দ এবং মানসিক চাপে অবশেষে ভেঙে পড়েন নরিয়েগা। ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি ভ্যাটিকান মিশন থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মার্কিন বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
পতন ও শেষ পরিণতি
গ্রেপ্তারের পর নরিয়েগাকে সোজা যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মাদক পাচার, অর্থ পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের দায়ে তার বিচার হয়। এক সময়ের প্রতাপশালী এই জেনারেলকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি নিজেকে ‘সিআইএ-এর হাতের পুতুল’ বা ব্যবহৃত বস্তুর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের কারাগারে দীর্ঘ সময় বন্দি থাকার পর ২০১১ সালে তাকে পানামায় ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে গৃহবন্দি অবস্থায় মস্তিষ্কের টিউমারজনিত জটিলতায় ভুগে ২০১৭ সালে ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বর্ণাঢ্য ও বিতর্কিত এই স্বৈরশাসক। মৃত্যুর আগে তিনি নিজের কৃতকর্মের জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক সমালোচনা
‘অপারেশন জাস্ট কজ’ সামরিকভাবে সফল হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। সার্বভৌম রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসনকে কিউবা, নিকারাগুয়া ও ভেনিজুয়েলা সরাসরি ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করে। এমনকি ইউরোপের অনেক দেশও এই একতরফা হামলার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে প্রেসিডেন্ট বুশ তার ভাষণে দাবি করেছিলেন, পানামায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মার্কিন নাগরিকদের জীবন রক্ষার্থেই এই অভিযান জরুরি ছিল।
ইতিহাসের পাতায় জেনারেল নরিয়েগার পতন কেবল একজন স্বৈরশাসকের বিদায় নয়, বরং এটি পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনীতি এবং মিত্র বদলের এক নির্মম সাক্ষী হয়ে আছে।
Analysis | Habibur Rahman
