১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:২০ সোমবার বসন্তকাল
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগ না আসার অর্থ হলো সরকারকে টাকা ছাপাতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত ঋণ এবং মূল্যস্ফীতি—উভয়ই বাড়িয়ে দেবে।

শুক্রবার (৮ নভেম্বর) সকালে চট্টগ্রামের র্যাডিসন ব্লু বে ভিউতে অনুষ্ঠিত এক অর্থনৈতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ফিউচার আউটলুক অব বাংলাদেশ ইকোনমি’ শীর্ষক এই সম্মেলনের আয়োজন করে দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), চট্টগ্রাম শাখা।
ঋণের ভয়াবহ চিত্র
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ঋণের চাপ কতটা প্রবল, তার একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সরকারের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে, তার ২১ শতাংশই চলে যাচ্ছে শুধু ঋণের সুদ টানতে। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি ঘণ্টায় আমাদের ১৪ কোটি টাকা সুদ বাবদ গচ্চা দিতে হচ্ছে।’
বিদেশি বিনিয়োগ কেন অপরিহার্য?
বিনিয়োগ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে কাজের জন্য বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী প্রস্তুত আছে, কিন্তু বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটাতে এফডিআই অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ না করার কোনো সুযোগ নেই। এটি এখন একটি গাণিতিক বাস্তবতা। আমরা যদি বিদেশ থেকে পুঁজি না আনি এবং এর বদলে টাকা ছাপাতে থাকি, তবে জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকবে এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার কখনো কমবে না। এতদিন যে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসেনি, তা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়।’
ভিয়েতনাম বনাম বাংলাদেশ: কোথায় গলদ?
পোশাক খাতের উৎপাদনশীলতা ও মুনাফার তুলনা করতে গিয়ে বিশেষ দূত ভিয়েতনামের উদাহরণ টানেন। তিনি বলেন, ‘একই পণ্য তৈরি করে ভিয়েতনামে শ্রমিকদের ৫০ শতাংশ বেশি বেতন দিয়েও কারখানাগুলো বেশি মুনাফা করছে। অথচ বাংলাদেশে সস্তা শ্রম সত্ত্বেও মুনাফা কম। এর কারণ হলো আমাদের সিস্টেমের অদক্ষতা। আমাদের মুনাফার অর্ধেক খেয়ে ফেলছে লজিস্টিকস, বন্দর ও সড়কের অব্যবস্থাপনা বা দীর্ঘসূত্রতা। আর বাকি অর্ধেক চলে যাচ্ছে দুর্নীতির পকেটে। এই সিস্টেম পরিবর্তন না করলে সংস্কার কেবল কথার কথাই থেকে যাবে।’
ঘাটতি বাজেট ও নজরদারি
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক—উভয় ধরনের ঘাটতির মুখে রয়েছে। আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কম হওয়ায় এই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ঋণ নেওয়াকে সরাসরি খারাপ না বললেও, সেই ঋণের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ঋণের টাকা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে নাকি অপচয় হচ্ছে, সেদিকে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ শাহীন। এছাড়া ভিডিও বার্তায় যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান।
সম্মেলন কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মেরাজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এস এম শোহরাবুদ্দীন।
Analysis | Habibur Rahman