১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সন্ধ্যা ৭:১৯ সোমবার বসন্তকাল
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস যেন সময়ের স্রোতে হারিয়ে না যায় এবং সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিতে ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ যেন সুরক্ষিত থাকে—সেই লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্ম ‘মনসুন প্রোটেস্ট আর্কাইভস’। বুধবার (আজ) সকালে রাজধানীর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ডিজিটাল আর্কাইভটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
নেত্র নিউজ, টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট—আন্তর্জাতিক ও প্রযুক্তিখাতের এই তিন প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে এই প্ল্যাটফর্মটি গড়ে তোলা হয়েছে।
আয়োজকরা জানান, এই আর্কাইভে কেবল বিক্ষিপ্ত ছবি বা ভিডিও নয়, বরং ৯৩৩ জন ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট ও যাচাইকৃত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটিতে আট হাজারেরও বেশি অডিও ও ভিডিও ফুটেজ, ঘটনাস্থলের বিবরণ, মৃত্যুর কারণ, আহতদের বর্তমান অবস্থা এবং এসব ঘটনায় জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে একটি ইন্টার্যাক্টিভ ম্যাপ বা মানচিত্রের মাধ্যমে তথ্যের ভিজ্যুয়াল প্রদর্শনীও রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রধান ফওজিয়া আফরোজ প্ল্যাটফর্মটির কারিগরি ও আইনি দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘অনলাইনের তথ্যপ্রমাণ যেকোনো সময় মুছে যেতে পারে। তাই জুলাইয়ের শুরু থেকেই আমরা এসব ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করি। এটি নিছক কোনো সংগ্রহশালা নয়; বরং এখানে সংরক্ষিত প্রতিটি ভিডিও ফুটেজ ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনাগুলো পুনর্নির্মাণ (Reconstruction) করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সত্য প্রতিষ্ঠা ও বিচারিক জবাবদিহিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
অনুষ্ঠানের প্যানেল আলোচনায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা উঠে আসে। গাজীপুরের কোনাবাড়িতে নিহত হৃদয়ের বোন জেসমিন আক্তার তার ভাইয়ের লাশ না পাওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট আমার ভাই শহীদ হন। শুনেছি পুলিশ তার লাশ তুরাগ নদীতে ফেলে দিয়েছে। ভাই যে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল তার সব প্রমাণ আছে, কিন্তু লাশটা পাইনি বলে তাকে শহীদের মর্যাদাও দেওয়া হয়নি।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) ঢাকা প্রধান হুমা খান বলেন, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সত্যকে লিপিবদ্ধ করা। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গুমবিরোধী আইন ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, যা আশাব্যঞ্জক। তবে র্যাব বিলুপ্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এ প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে বলে আমরা আশা করি।’
অন্যদিকে, সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বর্তমান বিচার প্রক্রিয়ার আইনি ও বাস্তবিক সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দণ্ডবিধি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল—উভয় বিচার ব্যবস্থাতেই কিছু দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণের অভাবে ঢালাও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। আবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও আইনজীবীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অভিজ্ঞতার ঘাটতিও রয়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘ডিজিটাল প্রমাণ, জব্দকৃত কল রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মামলা তৈরিতে সহায়তা করবে।’
ফওজিয়া আফরোজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্টের প্রধান ইয়াসমিন সুকা, নেত্র নিউজের এডিটর ইন চিফ তাসনিম খলিল এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক শাবনাজ রশিদ।
Analysis | Habibur Rahman

