১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:২৭ সোমবার বসন্তকাল
বার্লিন – একদিকে গাজার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে ইসরায়েলের জন্য অত্যাধুনিক অস্ত্রের গুদাম খুলে দেওয়া। জার্মানি ঠিক এই দুই নৌকায় পা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক তার নীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। सोमवार, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫-এ চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জের সরকার ইসরায়েলের ওপর থেকে অস্ত্র রপ্তানির আংশিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি জার্মানির নৈতিক অবস্থান এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের এক জটিল প্রতিচ্ছবি।
সরকারের মুখপাত্র সেবাস্তিয়ান হিলে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে “স্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি”র কথা বললেও, এই ঘোষণার গভীরে লুকিয়ে আছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। মাত্র তিন মাস আগে, যে জার্মান সরকার গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের তীব্রতায় “বিচলিত” হয়ে অস্ত্র রপ্তানিতে লাগাম টেনেছিল, সেই সরকারই এখন পরিস্থিতিকে “স্বাভাবিক” বলে আখ্যা দিচ্ছে। অথচ, এই সময়ের মধ্যে গাজার ধ্বংসস্তূপে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ২০ হাজারের বেশি শিশু।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, আগস্টে জার্মানি যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তা শুরু থেকেই ছিল ফাঁকফোঁকরে ভরা। এটি কেবল “গাজায় ব্যবহারযোগ্য” অস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, যা ছিল একটি অস্পষ্ট শর্ত। এর প্রমাণ মেলে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার দিনই ইসরায়েলের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ইউরোর একটি অত্যাধুনিক সাবমেরিন বিক্রির অনুমোদন দেওয়ার ঘটনায়। এমনকি নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ১০৮ দিনে পুরনো চুক্তি অনুযায়ী অস্ত্রের চালান অব্যাহত ছিল। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, নিষেধাজ্ঞাটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা, কার্যকর পদক্ষেপ নয়। তাই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সেই বার্তারই সমাপ্তি মাত্র।
চ্যান্সেলর মের্জের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন জার্মানির সাধারণ জনগণ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্রমশ সোচ্চার হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের এক জরিপে দেখা যায়, দেশের ৬২% মানুষ গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে “গণহত্যা” বলে মনে করে এবং ৭৩% নাগরিক অস্ত্র রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে। ৩০টিরও বেশি এনজিও এবং ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (ECCHR)-এর মতো সংস্থাগুলো জার্মানিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে আসছে। অর্থাৎ, জার্মান সরকার তার দেশের জনগণের এক বড় অংশের মতামতের বিপরীতে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জার্মানির এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে ইসরায়েল। তবে এর মাধ্যমে জার্মানি তার ইউরোপীয় মিত্রদের থেকেও নিজেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করলো। স্পেন, ইতালি, কানাডা ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো যখন ইসরায়েলের ওপর কম-বেশি নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে, তখন জার্মানির এই “ইউ-টার্ন” তাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং বর্তমান ভূ-রাজনীতির এক কঠিন টানাপোড়েনেরই ইঙ্গিত দেয়।
শেষ পর্যন্ত, জার্মানির এই সিদ্ধান্ত একটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে: হলোকাস্টের প্রতি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা কি বর্তমানের মানবিক বিপর্যয়কে উপেক্ষা করার যুক্তি হতে পারে? বার্লিন একদিকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলছে, গাজায় পুনর্গঠনের জন্য সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে সেই একই অঞ্চলে সংঘাতের জ্বালানি সরবরাহ করছে। এই দ্বৈত নীতি মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর শান্তিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
Analysis | Habibur Rahman


