৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:০৯ শুক্রবার গ্রীষ্মকাল
নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্দরে বেজে উঠেছে বিদ্রোহের সুর। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ঘোষিত প্রার্থী তালিকা কোনো ঐক্যের বার্তা না দিয়ে, উল্টো দেশজুড়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে অসন্তোষের আগুন। দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে রাজপথে নেমে এসেছেন হাজারো নেতাকর্মী, যা বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো এবং নেতৃত্বের কর্তৃত্বকে এক নজিরবিহীন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
৩ নভেম্বর রাতে যখন বিএনপি ২৩৭টি আসনে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে, তখন অনেকেই এটিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর একটি সুসংগঠিত দলের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু ঘণ্টা না পেরোতেই সেই ধারণা বদলে যায়। দলের সিদ্ধান্তকে “মানি না, মানব না” স্লোগানে প্রত্যাখ্যান করে রাজপথ অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ এবং অগ্নিসংযোগে উত্তাল হয়ে ওঠে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত।
এই বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। কুমিল্লা-৬ আসনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ায় বঞ্চিত নেতা আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের সমর্থকরা কান্দিরপাড় থেকে আলেখার চর পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। একই জেলার বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ায় নারীরা পর্যন্ত রাস্তায় বসে পড়েন প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে, যা দলীয় শৃঙ্খলার প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে।
এই বিক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামে শুধু মহাসড়ক নয়, রেললাইন উপড়ে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যা জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত করে। মাদারীপুরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে ভাঙচুর ও অবরোধের মুখে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রার্থীতা স্থগিত করতে বাধ্য হয়, যা প্রমাণ করে তৃণমূলের চাপ কতটা প্রবল।
চাঁদপুরে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর বিলবোর্ড পুড়িয়ে দেওয়া, মেহেরপুরে রাস্তায় শুয়ে পড়ে প্রতিবাদ, কিংবা দিনাজপুরে ক্ষুব্ধ समर्थকদের প্রতীকী ফাঁসির মঞ্চ তৈরি—প্রতিটি ঘটনাই ছিল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তৃণমূলের অনাস্থার এক একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। সাতক্ষীরায় ৩৩ জন নেতা সম্মিলিতভাবে মনোনয়ন বাতিলের আবেদন করে কার্যত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
এই নজিরবিহীন বিক্ষোভ কেবল মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রকাশ নয়, বরং এটি বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে পুষে রাখা এক গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মূলত ‘প্যারাসুট নেতা’ এবং ‘মাঠের কর্মী’-দের মধ্যকার আস্থার ফাটল। বহু বছর ধরে যারা দলের জন্য মাঠে থেকে মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, মনোনয়নের সময় কেন্দ্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নেতাকে তারা মেনে নিতে নারাজ।
এই অভ্যন্তরীণ গৃহদাহ এমন এক સમયે শুরু হলো, যখন দলটির একটি ঐক্যবদ্ধ চেহারা প্রদর্শন করা সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল। এই ঘটনা প্রতিপক্ষকে সমালোচনার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি দলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মনোবলের উপরও একটি বড় আঘাত।
চূড়ান্ত প্রশ্নটি হলো—এই গৃহদাহ কি দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের যন্ত্রণাময় প্রকাশ, নাকি জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার সামিল? এর উত্তরই হয়তো বিএনপির রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।
Analysis | Habibur Rahman


