.
বাংলাদেশ

হাতে স্বাস্থ্য কার্ড, তবুও চিকিৎসা নেই কেন? জুলাই আহতদের সাথে হাসপাতালে এ কেমন অবিচার?

Email :55

১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৩ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি রাত ১:০১ মঙ্গলবার বসন্তকাল

যে স্বাস্থ্য কার্ডটি ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত বীরদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান ও অগ্রাধিকার চিকিৎসার প্রতিশ্রুতির স্মারক, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে অবহেলা আর বঞ্চনার এক বেদনাদায়ক প্রতীকে
সরকারি হাসপাতালের দরজায় দরজায় ঘুরেও যখন সেই কার্ডধারীরা ন্যূনতম সেবাটুকু পাচ্ছেন না, তখন প্রশ্ন উঠেছে—এই ব্যর্থতার দায় কার?
এই গুরুতর পরিস্থিতিতে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে এসেছে কঠোর হুঁশিয়ারি—চিকিৎসা না দেওয়া হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য।


শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই তীব্র বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে, যখন জুলাইয়ের এক আহত ব্যক্তি নিজের স্বাস্থ্য কার্ড হাতে নিয়ে সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের কাছে তাঁর বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সেই হাসপাতালগুলোর চিত্র—যারা সরকারের লিখিত নির্দেশনাকে অগ্রাহ্য করে আহতদের ফিরিয়ে দিচ্ছে কিংবা অবহেলা করছে।

এই ঘটনায় দৃশ্যত বিচলিত ও দুঃখ প্রকাশ করে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান স্বীকার করেন যে, বারবার লিখিত নির্দেশনা পাঠানোর পরও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
তিনি বলেন, “কোনো হাসপাতাল যদি আহতদের চিকিৎসা, ওষুধ বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে অবহেলা করে, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।”
তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন, এই গাফিলতির চক্র ভাঙতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে আবারও কঠোর নির্দেশনা পাঠানো হবে।


গবেষণার ফলাফল:

এই ঘটনাটি ঘটে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে, যা আয়োজন করে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচএমিনেন্স
গবেষণাটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে। এতে দেখা যায়, জুলাইয়ের আহতদের চিকিৎসার পথ তিনটি প্রধান স্তরে ছিল কণ্টকাকীর্ণ।

প্রথমত – চিকিৎসা গ্রহণের ভয়:
রাজনৈতিক হয়রানির আশঙ্কা, কারফিউ বা অবরোধের কারণে চলাচলের প্রতিবন্ধকতা এবং অ্যাম্বুলেন্সের অভাবের মতো কারণে অনেকেই হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারেননি।

দ্বিতীয়ত – হাসপাতালের বিশৃঙ্খল বাস্তবতা:
যারা হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছেন, তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল নতুন সংগ্রাম।
উপচে পড়া ভিড়, ভর্তিতে দেরি, রেফারেলের জটিলতা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব—এমনকি কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসাকর্মীদের অনৈতিক আচরণ ও ঘুষের দাবির মতো ঘটনাগুলো তাদের শারীরিক কষ্টের সঙ্গে মানসিক যন্ত্রণাও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তৃতীয়ত – মৃত্যুর পরেও অসম্মানের গ্লানি:
সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো, মৃত্যুর পরেও মেলেনি সম্মান।
মরদেহ শনাক্তকরণে জটিলতা, পুলিশি বাধা এবং অপর্যাপ্ত মর্গ সুবিধার কারণে অনেক পরিবারকে চূড়ান্ত অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।


মূল কারণ ও বিশ্লেষণ:

গবেষকরা এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—
জরুরি পরিস্থিতিতে দিকনির্দেশনাহীন স্বাস্থ্য প্রশাসন, মেডিকো-লিগ্যাল কাঠামোর দুর্বলতা, এবং স্বাস্থ্যখাতকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বাইরে রাখার মতো গভীরতর সমস্যাগুলোকে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি কেবল জুলাই আহতদের প্রতি অবহেলা নয়; বরং এটি সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা।
এই ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—একটি বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটা ভঙ্গুর।

এখন দেখার বিষয়, সরকারের নতুন নির্দেশনা কি পারবে এই অচলায়তন ভাঙতে,
নাকি আহত বীরদের হাতের সেই স্বাস্থ্য কার্ডটি কেবলই ‘কাগুজে সম্মান’ হয়েই থেকে যাবে?

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts