.
অন্যান্য

নভেম্বরেই কেন চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বিস্ফোরণ? জানুন আসল কারণ ও বাঁচার উপায়। | Chattogram Dengue

Email :47

২১শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৬ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৬ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:২৮ শুক্রবার বসন্তকাল

যখন হেমন্তের শিশিরভেজা সকাল আর হালকা শীতের আমেজ দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার স্বস্তিদায়ক বার্তা নিয়ে আসে, ঠিক তখনই বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বাজে বিপদের ঘণ্টা। নভেম্বরের শুরুতেই এখানকার হাসপাতালগুলোর করিডোর এবং ওয়ার্ডগুলো ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীতে উপচে পড়ছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, অক্টোবরের তুলনায় এই মাসের প্রথম পাঁচ দিনেই সংক্রমণের হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সারা দেশের চিত্রের বিপরীতে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর এই নভেম্বরের উল্লম্ফনের পেছনের রহস্যটা কী?

বিশেষজ্ঞরা এর জন্য তিনটি প্রধান প্রভাবককে দায়ী করছেন, যা সম্মিলিতভাবে বন্দরনগরীর জন্য একটি ‘ভৌগোলিক ফাঁদ’ তৈরি করেছে।

প্রথমত, আবহাওয়ার বিশেষ চরিত্র। সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় নভেম্বরেও চট্টগ্রামের বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। দিনের বেলায় তাপমাত্রা মশার বিচরণের জন্য অনুকূল থাকে এবং রাতের শিশির বা হালকা বৃষ্টিপাত মশার লার্ভা জন্মানোর জন্য প্রয়োজনীয় স্থির পানির আধার তৈরি করে। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন অফিসের মহামারী বিশেষজ্ঞ ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, “ঢাকার তুলনায় এই সময়ে চট্টগ্রামের আর্দ্র জলবায়ু এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য একটি আদর্শ নার্সারিতে পরিণত হয়। একারণেই আমরা প্রতি বছর নভেম্বরে সংক্রমণের உச்சবিন্দু দেখতে পাই।”

দ্বিতীয়ত, অপরিকল্পিত নগরের অভিশাপ। শহরজুড়ে চলমান অসংখ্য নির্মাণাধীন ভবন, अपार्टमेंटের ছাদ ও বারান্দায় জমে থাকা পানি, এবং দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এডিস মশার জন্য তৈরি করেছে অসংখ্য নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে জমা হওয়া পানি দিনের পর দিন একই জায়গায় থেকে যাওয়ায় তা পরিণত হচ্ছে মশার বংশবিস্তারের উর্বর ভূমিতে। আগ্রাবাদ, হালিশহর এবং পাহাড়তলীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট।

এবং তৃতীয়ত, নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি। বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও, অনেকেই দিনের বেলায় মশারি ব্যবহার বা নিজেদের বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে উদাসীন। “ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের রোগ নয়, এটি একটি বছরব্যাপী স্থানীয় সমস্যা,” মন্তব্য করেন একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ এই লড়াইয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ না নেবে, ততক্ষণ শুধু ফগিং বা হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব।

পরিসংখ্যানও এই ভীতিকর ধারাবাহিকতার কথাই বলছে। গত দুই বছরের মতো এবারও নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রোগীর সংখ্যা অক্টোবরের পুরো মাসকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। ২০২৩ সালে যা ২৯% বৃদ্ধি পেয়েছিল, ২০২৪-এ তা ৩৭% ছাড়িয়ে যায়। এই বছরও প্রবণতা একই দিকে নির্দেশ করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জরুরি ভিত্তিতে নগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ফগিং কার্যক্রম শুরু করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমাধান লুকিয়ে আছে প্রতিটি বাড়িতে। “প্রতি তিন দিনে একবার জমে থাকা পানি ফেলে দিন এবং দিনের বেলায়ও সতর্ক থাকুন”—এই একটি অভ্যাসই পারে নভেম্বরে চট্টগ্রামের ডেঙ্গু-আতঙ্ককে প্রতিহত করতে। অন্যথায়, এই নভেম্বরের ধাঁধা প্রতি বছর আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts