১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৩৫ সোমবার বসন্তকাল
প্রচলিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিবর্তে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে হাতিয়ার করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়ে ওয়াশিংটনে যে নতুন সমীকরণের সূচনা করলেন, তা সরাসরি রাশিয়া ও চীনের দীর্ঘদিনের প্রভাব বলয়ে একটি সুস্পষ্ট নাড়া দেওয়ার সামিল। কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তানকে নিয়ে আয়োজিত এই সি-ফাইভ প্লাস ওয়ান (C5+1) শীর্ষ সম্মেলনকে ظاهراً অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মোড়ক দেওয়া হলেও, এর গভীরে রয়েছে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইঙ্গিত।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পর যেখানে মস্কো তার ঐতিহাসিক উঠোনকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে চাইছে এবং বেইজিং তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের মাধ্যমে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চালকের আসনে বসেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে নিছক একটি বৈঠক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত আমেরিকার এক কৌশলগত প্রত্যাবর্তন, তবে এবারের কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলোর মতো গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য চাপ প্রয়োগের পথে না হেঁটে, ট্রাম্প প্রশাসন এই অঞ্চলের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের সামনে সরাসরি লেনদেনের প্রস্তাব রেখেছে। এই প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিষয়: আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের যোগান নিশ্চিত করা, জ্বালানি খাতে অংশীদারিত্ব এবং চীনের বাণিজ্য পথগুলোর বিকল্প তৈরি করা। আমেরিকা স্পষ্টতই এই অঞ্চলকে শুধুমাত্র একটি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং একুশ শতকের প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য কাঁচামালের উৎস হিসেবে দেখছে।
এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করছে। প্রথমত, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে মস্কো এবং বেইজিংয়ের ওপর তাদের অতি-নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য একটি বিকল্প পথের সন্ধান দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে আমেরিকা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে, বিশ্বের কোনো কৌশলগত অঞ্চলকেই তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছেড়ে দেবে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘বাণিজ্যিক কূটনীতি’ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও একটি বড় সুযোগ। এই দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার চেষ্টা করছিল। এখন আমেরিকার প্রবেশ তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দেবে।
তবে এই উদ্যোগের সফলতা এখনই বলা সম্ভব নয়। রাশিয়া তার সামরিক ও ঐতিহাসিক প্রভাব এবং চীন তার অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে এই অঞ্চলে যে বলয় তৈরি করেছে, তা ভাঙা সহজ হবে না। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটনের এই অর্থনৈতিক করমর্দন মস্কো ও বেইজিংয়ের দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা প্রভাবকে সত্যিই দুর্বল করতে পারে, নাকি এটি শুধুমাত্র ক্ষমতার করিডোরে একটি ক্ষণস্থায়ী প্রতিধ্বনি হয়েই থেকে যাবে।
Analysis | Habibur Rahman


