.
বিনোদন

অস্তমিত বলিউডের ‘হি-ম্যান’: গ্রামের মেঠো পথ থেকে যেভাবে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন ধর্মেন্দ্র

Email :73

১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৫ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি রাত ১২:৩৩ মঙ্গলবার গ্রীষ্মকাল

বলিউডের স্বর্ণযুগের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্রটির পতন হলো। না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘হি-ম্যান’ খ্যাত কিংবদন্তি অভিনেতা ধর্মেন্দ্র। পর্দায় তার পেশিবহুল শরীর আর দৃপ্ত কণ্ঠস্বর যেমন অন্যায়কারীদের বুকে কাঁপন ধরাত, তেমনি তার রোমান্টিক চাউনি ঘায়েল করত অগণিত ভক্তের হৃদয়। প্রায় ছয় দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার শেষে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহানায়ক। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন তার বিশাল পরিবার, অঢেল সম্পদ এবং কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা।

তিন শর বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন ধর্মেন্দ্র। কোলাজ 📷 Image Source: Prothom Alo


১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের এক অখ্যাত গ্রাম শাহনেওয়াজ-এ জন্ম নেওয়া কৃষাণ দেওলের যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। ছোটবেলায় মাইলের পর মাইল হেঁটে স্কুলে যেতেন যে কিশোর, তার দুচোখ ভরা ছিল রুপালি পর্দার স্বপ্ন। প্রথাগত শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত হলেও, জীবনের পাঠশালায় তিনি ছিলেন এক সফল ছাত্র। ১৯60 সালে ফিল্মফেয়ারের ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে মুম্বাই আসা সেই তরুণটিই একদিন হয়ে ওঠেন বলিউডের অন্যতম স্তম্ভ। প্রথম ছবি ‘দিল ভি তেরা, হাম ভি তেরে’ দিয়ে শুরু হলেও, ‘শোলা অউর শবনম’ এবং বিমল রায়ের ‘বন্দিনী’ তাকে পরিচিতি এনে দেয়।


ধর্মেন্দ্রকে কেবল অ্যাকশন বা রোমান্টিক হিরো হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা ভুল হবে। ‘সত্যকাম’ ছবিতে একজন আদর্শবাদী মানুষের চরিত্রে তিনি যে অভিনয়শৈলী দেখিয়েছিলেন, তা আজও সমালোচকদের প্রশংসার দাবি রাখে। হৃষিকেশ মুখার্জির ‘চুপকে চুপকে’ ছবিতে তার হাস্যরস কিংবা ‘শোলে’র বীরু চরিত্রে তার উপস্থিতি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন নায়ক চাইলে কমেডি, ট্র্যাজেডি এবং অ্যাকশন—সব বিভাগেই সমান পারদর্শী হতে পারেন।

নিজেকে তিনি কখনোই ‘তারকা’ মনে করতেন না। তার ভাষায়, “আমি আগে একজন মানুষ, তারপর শিল্পী।” খ্যাতির শিখরে থেকেও তিনি ভালোবাসতেন তার শেকড়কে। লোনাভালার ফার্ম হাউসে ট্রাক্টর চালানো, ফসলের যত্ন নেওয়া আর গবাদিপশুর পরিচর্যার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেতেন পরম শান্তি।


পর্দার বাইরে ধর্মেন্দ্রর জীবন ছিল সিনেমার মতোই নাটকীয়। হেমা মালিনীর সঙ্গে তার প্রেমকাহিনি বলিউডের লোকগাঁথায় পরিণত হয়েছে। প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌরের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং ‘ড্রিম গার্ল’-এর সঙ্গে নতুন সংসার—দুটিই সামলেছেন নিজস্ব কায়দায়। হেমা মালিনীর মতে, ধর্মেন্দ্র ছিলেন বাইরে কঠোর কিন্তু ভেতর থেকে অসম্ভব নরম মনের এক মানুষ, যিনি শায়েরি লিখতে ভালোবাসতেন।


অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মাধ্যমে ধর্মেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন বিশাল সম্পদ। রিপোর্ট অনুযায়ী, তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায়)। তবে তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মানুষের ভালোবাসা। পদ্মভূষণ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা—সবই তার অর্জনের ঝুলিতে জমা হয়েছে। এমনকি রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন সফল; বিকানির থেকে লোকসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন।


বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও মনের জোর কমেনি তার। ২০০৭ সালে ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’ এবং ‘জনি গাদ্দার’-এর মতো আধুনিক ঘরানার ছবিতে অভিনয় করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, অভিনেতার কোনো বয়স হয় না। চলতি বছরের ডিসেম্বরে মুক্তি পেতে যাওয়া ‘ইক্কিস’ সিনেমায় দর্শক হয়তো শেষবারের মতো এই মহাতারকাকে পর্দায় দেখতে পাবেন।

পাঞ্জাবের সেই মাটির মানুষটি আজ নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ‘শোলে’, ‘ধরম বীর’, ‘আপনে’র মতো অসংখ্য সৃষ্টি তাকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ধর্মেন্দ্র চলে গেলেন, কিন্তু তার সেই চিরচেনা হাসি আর দৃপ্ত সংলাপ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে খোদাই হয়ে রইল অনন্তকালের জন্য।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts