৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:১২ শনিবার বসন্তকাল
নরওয়ের শান্ত রাজপরিবারে এখন ঝড়ের আভাস। দেশটির ভবিষ্যৎ রানি বা ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-ম্যারিটের বড় ছেলে মারিয়াস বোর্গ হোইবিকে কেন্দ্র করে একের পর এক কেলেঙ্কারি সামনে আসছে। ধর্ষণ, ছুরি হামলা এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করাসহ মোট ৩৮টি গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন ২৯ বছর বয়সী মারিয়াস। এই ঘটনায় নরওয়ের রাজপরিবারের ভাবমূর্তি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার অসলোতে মারিয়াসের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর ঠিক আগেই, গত রোববার তাকে চতুর্থবারের মতো গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ।

অভিযোগের পাহাড় ও গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মারিয়াস বোর্গ হোইবির বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মোট ৩৮টি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে চারজন ভিন্ন নারীকে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ।
সর্বশেষ তাকে গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে পুলিশ উল্লেখ করেছে একটি ছুরি হামলার ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এক নারীর ওপর ছুরি নিয়ে চড়াও হয়েছিলেন। এর আগেও তার বিরুদ্ধে একাধিকবার সঙ্গিনীদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। নরওয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, মারিয়াসকে চার সপ্তাহের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের ধারণা, তিনি জামিনে মুক্ত থাকলে পুনরায় একই ধরনের সহিংস অপরাধ ঘটাতে পারেন এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করতে পারেন।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে শুরু করে এ নিয়ে মোট চারবার পুলিশের হাতে আটক হলেন রাজপরিবারের এই সদস্য।
রাজকীয় পরিচয় বনাম বিতর্কিত জীবন
মারিয়াস বোর্গ হোইবি নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-ম্যারিটের আগের পক্ষের সন্তান। তিনি দেশটির সিংহাসনের সরাসরি উত্তরাধিকারী নন, তবে ক্রাউন প্রিন্স হাকনের সৎছেলে হিসেবে রাজপরিবারের সঙ্গেই বেড়ে উঠেছেন। তবে রাজকীয় আদব-কায়দার পরিবর্তে বিতর্কিত জীবনযাপনের জন্যই তিনি বারবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, মারিয়াস দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৩ সালে নরওয়ের পুলিশ তাকে কুখ্যাত অপরাধী চক্র বা ‘গ্যাং’ সদস্যদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করতে সতর্ক করেছিল। এর আগে ২০১৭ সালে একটি সংগীত উৎসবে কোকেন সেবনের দায়েও তাকে আটক করা হয়েছিল। তার সাবেক প্রেমিকা নোরা হাউকল্যান্ডই প্রথম সাহসিকতার সঙ্গে মারিয়াসের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ জনসমক্ষে এনেছিলেন, যা পরে অন্য ভুক্তভোগীদের মুখ খুলতে সাহস যোগায়।
মায়ের অতীত ও বর্তমান সংকট
ছেলের এই অধঃপতনের সময়ে রাজপরিবারকে নতুন করে বিব্রত করছে ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-ম্যারিটের পুরোনো একটি বিতর্ক। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক ও মানবপাচারকারী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে নরওয়ের এই যুবরাজ্ঞীর যোগাযোগের বিষয়টি ফের আলোচনায় উঠে এসেছে।
প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, মেটে-ম্যারিট ফ্লোরিডায় এপস্টেইনের বাড়িতে একাধিক রাত কাটিয়েছিলেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন, এপস্টেইনের অপরাধ জগত সম্পর্কে তিনি তখন জানতেন না। নিজের এই যোগাযোগকে তিনি ‘অবিবেচক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং এপস্টেইনের শিকার হওয়া নারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। তবে মা ও ছেলের জোড়া বিতর্কে রাজপরিবার এখন ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে।
আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
মারিয়াস হোইবির আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালতে বিচার কাজ শুরু হলে তিনি কিছু লঘু অপরাধের দায় স্বীকার করতে পারেন। তবে ধর্ষণ এবং গুরুতর শারীরিক হামলার মতো বড় অভিযোগগুলো তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
নরওয়ের সাধারণ জনগণ ও রাজতন্ত্রের সমালোচকরা এখন তাকিয়ে আছেন মঙ্গলবারের বিচার প্রক্রিয়ার দিকে। রাজপ্রাসাদের ভেতরের এই অন্ধকার অধ্যায় দেশটির সমাজজীবনে এবং রাজতন্ত্রের জনপ্রিয়তায় কেমন প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
Analysis | Habibur Rahman