১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৬:৩৬ সোমবার বসন্তকাল
দীর্ঘ আইনি রশি টানাটানি ও রাজনৈতিক উত্তেজনার পর অবশেষে মার্কিন কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে সম্মত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তদন্তে গঠিত ‘হাউস ওভারসাইট কমিটি’র সামনে সাক্ষ্য দেবেন তাঁরা। মূলত কংগ্রেস অবমাননার (Contempt of Congress) মতো গুরুতর অভিযোগ ও ভোটাভুটি এড়াতেই শেষ মুহূর্তে এসে এই সিদ্ধান্ত নিলেন ডেমোক্র্যাট দলের প্রভাবশালী এই দম্পতি।

প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক চাপ
রিপাবলিকান দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা হাউস ওভারসাইট কমিটি বেশ কিছুদিন ধরেই ক্লিনটন দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে আসছিল। কমিটি ক্লিনটনদের বিরুদ্ধে তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ আনে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস অবমাননার প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এই প্রস্তাবে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্যও সমর্থন জানিয়েছিলেন। ভোটাভুটির মাত্র কয়েক দিন আগে, বড় ধরনের আইনি জটিলতা এড়াতে সোমবার রাতে কমিটি সমীপে হাজির হওয়ার সম্মতি জানান তাঁরা।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
বিল ক্লিনটন যদি সশরীরে এই তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হন, তবে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা হিসেবে নথিবদ্ধ হবে। ১৯৮৩ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড সর্বশেষ কোনো কংগ্রেসনাল কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পর কোনো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিল ক্লিনটন সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছেন। তবে শুনানির দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।
বক্তব্য ও পাল্টা অভিযোগ
সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) বিল ক্লিনটনের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ অ্যাঞ্জেল উরেনিয়া এই খবর নিশ্চিত করেন। তবে তিনি তদন্ত কমিটির কঠোর সমালোচনা করেছেন। উরেনিয়ার ভাষ্যমতে, ক্লিনটন দম্পতি শুরু থেকেই সরল বিশ্বাসে আলোচনার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কমিটি তাতে কর্ণপাত করেনি।
তিনি বলেন, “সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যেই শপথপূর্বক তাঁদের জানা তথ্য হলফনামা আকারে জমা দিয়েছেন। কিন্তু কমিটি তা গ্রাহ্য করছে না। তবুও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং সবার জন্য প্রযোজ্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে তাঁরা সাক্ষ্য দিতে যাবেন।”
অন্যদিকে ক্লিনটন দম্পতি এই পুরো প্রক্রিয়াকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্ররোচনায় সৃষ্ট ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিব্রত করতেই এই সমন জারি করা হয়েছে।
তবে হাউস ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। ক্লিনটনদের আইনি দলকে বারবার সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কেবল কালক্ষেপণ করেছেন। এই তলব প্রক্রিয়াটি উভয় দলের সম্মতিতে অনুমোদিত হয়েছে।”
তদন্তে উঠে আসা তথ্য ও ছবি
২০১৯ সালে জেলহাজতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণকারী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে বিল ক্লিনটনের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন রয়েছে। বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিপত্র এবং ফ্লাইট লগবুক অনুযায়ী, ২০০২ ও ২০০৩ সালে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে চারটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ভ্রমণ করেছিলেন বিল ক্লিনটন।
এছাড়া তদন্তের অংশ হিসেবে বেশ কিছু ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে। এর মধ্যে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বাসভবনে, সুইমিং পুলে এবং হট টাবে সাবেক প্রেসিডেন্টকে দেখা গেছে। একটি ছবিতে তাঁকে এক নারীর সঙ্গে বাথটাবেও দেখা গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
তবে বিল ক্লিনটনের মুখপাত্র বরাবরই দাবি করে আসছেন, এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার বহু আগেই ক্লিনটন তাঁর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। এপস্টেইনের কোনো যৌন অপরাধ সম্পর্কে তিনি জানতেন না এবং কোনো ভুক্তভোগী সরাসরি বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগও করেননি। ক্লিনটন ক্যাম্পের দাবি, ছবিগুলো কয়েক দশকের পুরোনো এবং সেসময়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল।
সম্প্রতি কমিটির চেয়ারম্যানকে লেখা এক চিঠিতে ক্লিনটন দম্পতি তদন্তের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, “চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি তদন্তের নামে যা করছেন, তা সত্য উদ্ঘাটনের বদলে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের নামান্তর।”
এখন দেখার বিষয়, কংগ্রেসের এই হাই-প্রোফাইল শুনানি মার্কিন রাজনীতিতে নতুন কোনো ঝড়ের জন্ম দেয় কি না। Analysis | Habibur Rahman