৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৫০ শনিবার বসন্তকাল
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগরের আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ সংসদীয় আসন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জনপদ এখন সরগরম। তবে নির্বাচনী মাঠের চিত্র বলে দিচ্ছে, লড়াইটা সবার জন্য সমান নয়। একদিকে বড় দলগুলোর বিত্তবৈভব আর জমকালো প্রচার, অন্যদিকে স্বল্প আয়ের প্রার্থীদের ‘বিনা মাইকিংয়ে’ অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা। এই আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূলত অর্থের দাপট এবং পরিচিতির আকাঙ্ক্ষার এক অদ্ভুত বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে এখানে।
বিত্তবান বনাম অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
এই আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের পোস্টার আর ব্যানারে আকাশ ঢেকে গেলেও, এমন কয়েকজন প্রার্থী আছেন যাদের লক্ষ্য বিজয় নয়, বরং সম্মানজনক কিছু ভোট পাওয়া এবং নিজের পরিচিতি বাড়ানো। তাদেরই একজন গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মিজানুর রহমান। ‘ট্রাক’ প্রতীক নিয়ে মাঠে নামা এই প্রার্থীর নির্বাচনী তহবিল বা ‘ফান্ড’ নগণ্য।
মিজানুর রহমান অকপটে স্বীকার করেছেন তার সীমাবদ্ধতার কথা। তিনি জানান, বড় দলের প্রার্থীদের মতো তার কোনো স্পন্সর নেই, নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই নামমাত্র প্রচার চালাচ্ছেন। অর্থাভাবে ব্যানার-ফেস্টুন ছাপাতে পারেননি, কেবল কিছু লিফলেট বিতরণেই সীমাবদ্ধ তার কার্যক্রম। মাইকিং করার মতো বাজেটও তার নেই। তবু তিনি হাল ছাড়েননি, লক্ষ্য একটাই—ভোটারদের কাছে নিজেকে তুলে ধরা।
একই পরিস্থিতির শিকার বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিন। পেশায় সাবেক এই সাংবাদিকের প্রতীক ‘রকেট’। জমানো বেতনের সামান্য টাকা দিয়েই নির্বাচনের খরচ মেটাচ্ছেন তিনি। তার কথায়, “কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ওড়ানোর সামর্থ্য আমার নেই, কিন্তু নির্বাচনে থাকার ইচ্ছেটা প্রবল।”
মাঠ কাঁপাচ্ছেন ববি হাজ্জাজ ও মামুনুল হক
স্বল্প পুঁজির প্রার্থীদের এই সংগ্রামের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন ববি হাজ্জাজ। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ছেড়ে গত ডিসেম্বরে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজের প্রচারণায় কোনো কমতি নেই।
অন্যদিকে, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে সরব জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার প্রতীক ‘রিকশা’।
মোহাম্মদপুর, বসিলা, লালমাটিয়া থেকে শুরু করে শেরেবাংলা নগরের অলিগলি—সর্বত্রই এই দুই প্রার্থীর পোস্টার ও বিলবোর্ডের ছড়াছড়ি। পিসিকালচার হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, তাজমহল রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তাদের কর্মীবান্ধব প্রচার চোখে পড়ার মতো।
একমাত্র নারী প্রার্থীর অভিযোগ ও প্রত্যয়
ঢাকা-১৩ আসনের ৯ প্রার্থীর ভিড়ে একমাত্র নারী মুখ ফাতেমা আক্তার। ইনসানিয়াত বিপ্লব দলের হয়ে ‘আপেল’ প্রতীকে লড়ছেন তিনি। মোহাম্মদপুর মকবুল হোসেন কলেজের ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষার্থী জানান, তিনি আদতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভোটার হলেও দীর্ঘদিনের বসবাসের সুবাদে এই এলাকার সমস্যাগুলো তার নখদর্পণে।
তবে প্রচারণায় নেমে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন ফাতেমা। অভিযোগ করেছেন, শুরুতে ব্যানার-ফেস্টুন লাগালেও কে বা কারা সেগুলো সরিয়ে ফেলেছে। তবুও দমে যাননি তিনি। তার মতে, “মানুষ পরিবর্তন চায়, আর সেই পরিবর্তনের বার্তা নিয়েই আমি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি।”
অন্যান্য প্রার্থীর হালচাল
নির্বাচনী মাঠে সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ মনোনীত প্রার্থী মো. খালেকুজ্জামান ‘মই’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তাজমহল রোড ও আসাদ গেট এলাকায় তার দলের কিছু ব্যানার চোখে পড়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মো. রবিউল ইসলাম ‘ঘুড়ি’ প্রতীক নিয়ে সামান্য পরিসরে প্রচার চালাচ্ছেন।
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ‘ছায়াতল বাংলাদেশ’ নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সোহেল রানা নির্বাচন করছেন ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা এই সমাজকর্মী জানান, আর্থিক সহায়তা পেলে তিনি প্রচারে আরও গতি আনতে পারতেন। অন্যদিকে, ‘হারিকেন’ প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শাহরিয়ার ইফতেখার প্রার্থী হলেও মাঠে তার কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা নেই।
ভোটার পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ঢাকা-১৩ আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৯১ জন। আগামী নির্বাচনে এই বিপুল সংখ্যক ভোটার ৯ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে কাকে বেছে নেবেন, তা সময় বলে দেবে। তবে ভোটের ফলাফলের চেয়েও এই আসনে বিত্ত আর আদর্শের অসম লড়াইটাই এখন প্রধান আলোচনার বিষয়।
Analysis | Habibur Rahman
