৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৫৩ শনিবার বসন্তকাল
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে বৃহৎ আকারের দুর্নীতিতে লাগাম টানা সম্ভব হলেও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো রয়ে গেছে অনিয়ম। বিশেষ করে ‘মামলা ও বদলি বাণিজ্য’ এখনো অব্যহত রয়েছে। শিক্ষাখাতের উদাহরণ টেনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানিয়েছেন, বর্তমানে একটি কলেজে বদলি হতেও ৮ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাকে জানিয়েও কোনো সুরাহা মেলেনি।

বুধবার (আজ) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) অডিটরিয়ামে আয়োজিত সদস্যদের সন্তানদের বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতা ও তদবির সংস্কৃতি
শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের সময়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “মন্ত্রণালয়ে এখনো শত শত তদবির আসে। আগে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পৌঁছে দিলেই কাজ হয়ে যেত, কাউকে মন্ত্রণালয়ে সশরীরে আসতে হতো না। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। অনেকেই ভাবছেন নতুন সুযোগ এসেছে, তাই সরাসরি মন্ত্রণালয়ে ভিড় করছেন। আমার কক্ষের সামনেও অসংখ্য মানুষের জটলা থাকত, তাদের ডিঙিয়ে আমাকে অফিসে প্রবেশ করতে হতো।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্নীতির ধরণ পাল্টালেও তা নির্মূল হয়নি। কলেজ পর্যায়ে বদলির জন্য ৮ লাখ টাকা দাবির বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থাকে তদন্ত করতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা এর সাথে জড়িতদের বা সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ভঙ্গুর অর্থনীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি যে হারে কমার প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। সবদিক বিবেচনা করে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের আশেপাশে থাকতে পারে।”
বিগত সরকারের সমালোচনা ও ব্যাংক খাত
আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচনা করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিগত সময়ে বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে অর্থনীতিকে ভালো দেখানোর চেষ্টা করা হলেও ভেতরটা ছিল ফাঁপা। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। আর্থিক খাতের চরম বিশৃঙ্খলা বাজেটের শৃঙ্খলায় ধস নামিয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে।
তিনি মন্তব্য করেন, “২০২৪ সালে যদি এই গণ-অভ্যুত্থান নাও হতো, তবে এটি পরবর্তীতে হওয়া ছিল অবধারিত। যারা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছেন, তারা নিজেরাও জানতেন যে কোনো সময় বড় ধরনের পতন ঘটবে। তাই তারা অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর অবস্থায় রেখে গেছেন।”
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও মানবসম্পদ
বর্তমান সরকারকে অনেকে ‘এনজিও সরকার’ হিসেবে অভিহিত করলেও তারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “এটি মূলত গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রত্যাশা পূরণের সরকার। তবে অভ্যুত্থানের পর যুবসমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আগামীতে যেকোনো সরকারের জন্যই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং এই অস্থিরতা নিরসন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”
বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগঠনের সদস্যদের মেধাবী সন্তানদের মাঝে বৃত্তি প্রদান করা হয়। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী এবং ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আবদুল মোমেনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা।
Analysis | Habibur Rahman