.
আন্তর্জাতিক

মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে নক্ষত্রপতন: বিমান দুর্ঘটনায় থামল ‘দাদা’ অজিত পাওয়ারের বর্ণাঢ্য যাত্রা

Email :55

১৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি সন্ধ্যা ৬:৪১ সোমবার শরৎকাল

ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। বুধবার এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অজিত পাওয়ার। ৬৬ বছর বয়সী এই নেতার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা রাজ্য। কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ই নয়, মহারাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংস্কার ও গ্রামীণ উন্নয়নের অন্যতম কারিগর হিসেবে তিনি দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

গ্রাম থেকে মসনদে: এক অসাধারণ উত্থান
১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই আহমেদনগরের দিওলালি প্রাভরা গ্রামে জন্ম নেওয়া অজিত পাওয়ারের রাজনীতিতে উঠে আসার গল্পটি ছিল মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। গ্রামীণ জীবনের কঠোর বাস্তবতা এবং কৃষকদের সংগ্রামকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে পরবর্তীতে রাজ্যের শাসনক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে সহায়তা করে।

তাঁর রাজনৈতিক হাতেখড়ি হয় সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৮২ সালে একটি স্থানীয় চিনিকলের বোর্ডে জয়ী হয়ে তিনি জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি পুনে ডিস্ট্রিক্ট সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সমবায় খাতের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তাঁর শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়, যা তাকে পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে অপরিহার্য করে তোলে।

শরদ পাওয়ারের ছায়া থেকে স্বকীয়তায়
সম্পর্কে তিনি ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবীণ নেতা শরদ পাওয়ারের ভাইপো। রাজনৈতিক মহিরুহ কাকার হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও, অজিত পাওয়ার নিজের দক্ষতাতেই দলে ও সরকারে নিজের স্থান পাকা করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে শরদ পাওয়ার কংগ্রেস ছেড়ে এনসিপি গঠন করলে, অজিত সেখানে অন্যতম প্রধান কৌশলী হিসেবে আবির্ভূত হন।

বারামতি: অজয়ের দুর্গ
রাজনীতিতে অজিত পাওয়ারের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাঁর নির্বাচনী এলাকা বারামতি। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো এই আসন থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টানা ছয়বার এই আসন থেকে জয়ী হয়ে তিনি বারামতিকে নিজের দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেন।

তবে কেবল জয়ী হওয়াই নয়, বারামতিকে উন্নয়নের মডেলে রূপান্তর করার কৃতিত্বও তাঁকে দেওয়া হয়। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকাকে রাজ্যের অন্যতম আদর্শ কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন।

অর্থনৈতিক চাণক্য ও দক্ষ প্রশাসক
মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে অজিত পাওয়ার কেবল একজন নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক ও অর্থনৈতিক কৌশলবিদ। রাজ্যের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে তিনি একাধিকবার বাজেট পেশ করেছেন। অর্থনীতিতে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি, ঘাটতি ব্যবস্থাপনা এবং জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখার দক্ষতা তাকে ‘রাজ্যের অন্যতম সেরা অর্থমন্ত্রী’র খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এছাড়াও পানিসম্পদ, জ্বালানি এবং গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবেও তিনি নিজের কর্মদক্ষতার ছাপ রেখেছেন।

সবার প্রিয় ‘দাদা’
সমর্থক ও দলীয় কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘দাদা’। রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাই এবং মাঝেমধ্যে বিতর্কের মুখে পড়লেও, মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। সরকার গঠন, জোট রাজনীতি এবং বিধানসভায় সংকট ব্যবস্থাপনায় তিনি ছিলেন এনসিপির তুরুপের তাস। দলের ভেতরে ও বাইরে তাঁর অনুগত এক বিশাল কর্মী বাহিনী ছিল, যারা তাঁকে রাজ্যের ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করতেন।

বুধবারের এই বিমান দুর্ঘটনা কেবল একজন উপমুখ্যমন্ত্রীর প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং মহারাষ্ট্র হারাল তার মাটি থেকে উঠে আসা এক অভিজ্ঞ জননেতাকে, যিনি গ্রামীণ অর্থনীতি ও আধুনিক প্রশাসনের মেলবন্ধন ঘটাতে জানতেন।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts