১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৮:২৫ সোমবার বসন্তকাল
লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় নেওয়ার পর এবার ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সামনে কঠিন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে হোয়াইট হাউস। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের চাওয়া পূরণ না করলে দেলসিকে তাঁর পূর্বসূরি নিকোলাস মাদুরোর মতোই ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
আজ বুধবার মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটির শুনানিতে ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে রুবিওর। এএফপির হাতে আসা তাঁর বক্তব্যের খসড়া থেকে জানা যায়, তিনি দেলসি রদ্রিগেজকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় কাজ করার জন্য সরাসরি চাপ প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন।

‘সহযোগিতা অথবা শক্তি প্রয়োগ’
সিনেট কমিটির সামনে রুবিও যে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন, সেখানে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চেয়ে হুমকির সুরই বেশি প্রবল। তিনি উল্লেখ করবেন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান দেলসি রদ্রিগেজ খুব ভালোভাবেই জানেন মাদুরোর কী পরিণতি হয়েছে। রুবিও মনে করেন, দেলসির ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য এখন একই সুতোয় গাঁথা। অর্থাৎ, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে দেলসিকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনেই চলতে হবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে রুবিও জানান, অন্য কোনো কৌশলে কাজ না হলে যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করবে না। রুবিওর খসড়া বক্তব্যে বলা হয়েছে, “ভুল করবেন না—প্রেসিডেন্ট যেমনটি বলেছেন, সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগেও প্রস্তুত আছি।”
মূলত, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থরক্ষা এবং ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টিই ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মাদুরোকে ‘তুলে আনা’ এবং রুবিওর সাফাই
গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক অভাবনীয় সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। সেখান থেকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে সরাসরি নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তাঁরা নিউইয়র্কের একটি ডিটেনশন সেন্টারে বিচারের অপেক্ষায় আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মাদুরো কোনো বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান নন, বরং একজন মাদক কারবারি।
সিনেটে দেওয়া বক্তব্যে রুবিও এই অভিযানের পক্ষে সাফাই গাইবেন। তিনি মাদুরোকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ‘আইনসম্মত’ এবং ‘কম খরচে বড় সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, কোনো মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানি ছাড়াই দুজন মাদক পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে, যা ইতিহাসে বিরল।
তবে ভেনেজুয়েলার সরকারি ভাষ্যমতে, ওই অভিযানে মাদুরোকে রক্ষা করতে গিয়ে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের পাশাপাশি কিউবার নাগরিকরাও ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক
ভেনেজুয়েলায় এই আকস্মিক সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও ঝড় উঠেছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের সঙ্গে ছলনা করেছে এবং ‘ওয়ার পাওয়ার অ্যাক্ট’ বা যুদ্ধকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই সাবেক সিনেটর এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেট কমিটির সামনে হাজিরা দিতে রাজি হয়েছেন।
দেলসির সামনে কঠিন সমীকরণ
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে মাদুরোকে পশ্চিমা বিশ্ব আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিল। মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর দেলসি রদ্রিগেজ দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তাঁর ক্ষমতা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। রুবিওর এই হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করে দেয় যে, ভেনেজুয়েলার তেল ও অর্থনীতি নিয়ে ওয়াশিংটনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন না করলে দেলসি রদ্রিগেজের পরিণতিও সুখকর হবে না।
এখন দেখার বিষয়, কারাকাসের মসনদে বসে দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের এই চরমপত্রের বিপরীতে কী কৌশল অবলম্বন করেন।
Analysis | Habibur Rahman