৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৫৩ শনিবার বসন্তকাল
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অতীত কর্মকাণ্ড এবং ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি মন্তব্য করেছেন, অতীতে বিভিন্ন অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের সময় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ‘পাপেট’ বা পুতুলের মতো আচরণ করেছে, যা গণতন্ত্র ও অর্থনীতির জন্য মোটেও শুভ ছিল না। একইসঙ্গে তিনি এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের সময় পেছানোর দাবির বিপক্ষে নিজের জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছেন।

মঙ্গলবার (আজ) রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত ‘স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ: ব্যাংকিং খাতে প্রভাব’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘পুতুলের মতো আচরণ’ প্রসঙ্গ
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের পেশাদারিত্বের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গভর্নর। তিনি বলেন, বিগত সময়ে যখন ব্যাংক ঋণের সুদহার কৃত্রিমভাবে ৬ থেকে ৯ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তার প্রতিবাদ না করে বরং হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিল। এমনকি দেশ থেকে যখন বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছিল, তখনও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘‘ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পাপেটের (পুতুল) মতো আচরণ করেছে। এমন সুবিধাবাদী আচরণ ও নীরবতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে না। এফবিসিসিআইসহ অন্য সংগঠনগুলোকে ভবিষ্যতে আরও পেশাদার এবং দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাই।’’
এলডিসি উত্তরণ: আত্মসম্মান বনাম সুবিধা
ব্যবসায়ী নেতারা এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর পক্ষে যুক্তি দিলেও গভর্নর এর বিরোধিতা করেন। তিনি স্পষ্ট করেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকা বাংলাদেশের জন্য আর সম্মানের নয়।
গভর্নর বলেন, ‘‘বাংলাদেশকে সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত বা পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর কাতারে রাখা উচিত নয়। জিডিপিসহ উন্নয়নের নানা সূচকে আমরা তাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারত বা মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশের সারিতে জায়গা করে নেওয়া এবং বৈশ্বিক সম্মান অর্জন করা। ছোটখাটো কিছু বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য বড় অর্জন বা সম্মান আমরা হাতছাড়া করতে পারি না।’’
অর্থনীতির চালচিত্র ও ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্বেগ
গোলটেবিলে ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদহার ও কর্মসংস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আইসিসি বাংলাদেশের সহসভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ বলেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে সুদহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে।
এ কে আজাদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘‘ইতোমধ্যে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং আগামী ৬ মাসে আরও ১২ লাখ মানুষ কর্মহীন হতে পারেন। দেশে বিনিয়োগ স্থবির, রাজস্ব আদায় কমেছে। বর্তমান মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতি সচল রাখা কঠিন। তাই নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের প্রধান দাবি হওয়া উচিত এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া, কারণ সরকারকে পরিস্থিতি সামলে উঠতে সময় দিতে হবে।’’
পাচার হওয়া অর্থ ও সুদহার বৃদ্ধি
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের জবাবে গভর্নর স্বীকার করেন যে দেশে সুদের হার বর্তমানে বেশি। তবে এর পেছনের কারণ হিসেবে তিনি বিগত সময়ের অর্থ পাচার ও ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন।
ড. মনসুর বলেন, ‘‘এটা মানতে হবে যে দেশ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থায় চিড় ধরেছিল। আমানতের প্রবৃদ্ধি একসময় ৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, যা এখন বেড়ে ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে সুশাসন ও তদারকি নিশ্চিত করা গেলে সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতি—উভয়ই কমে আসবে।’’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর জোর দেন গভর্নর। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আধুনিক ও স্বাধীন করতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার’ সংশোধন করা জরুরি।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আইন সংস্কারের প্রস্তাব চার মাস আগেই সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে এটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে এই আইনের অনুমোদন অতি জরুরি।’’
অন্যান্য বক্তা ও অংশগ্রহণকারী
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় এবং সংস্থাটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ (রুমী) আলীর স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএম-এর অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, প্লামি ফ্যাশনসের এমডি মো. ফজলুল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংকের এমডি হাসান ও. রশিদ, এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইও নাসের এজাজ বিজয়সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা। বক্তারা এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নীতি সহায়তা ও প্রস্তুতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
Analysis | Habibur Rahman