১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল
ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে আবারও চরম মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ দিনে ভূমধ্যসাগরের মধ্যভাগে একাধিক নৌকাডুবির ঘটনায় কয়েক শ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিখোঁজ অথবা প্রাণ হারিয়েছেন বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিরূপ আবহাওয়া এবং পাচারকারীদের দৌরাত্ম্যে সাগরের বুকে এই মৃত্যুমিছিল ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে।

মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ ও যমজ শিশুর বিয়োগান্ত পরিণতি
আইওএম-এর সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক কিছু চিত্র। ইতালির ল্যাম্পেদুসা দ্বীপের কাছে সম্প্রতি একটি নৌকা থেকে উদ্ধারকৃতদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিউনিসিয়ার উপকূলীয় শহর স্যাফ্যাক্স থেকে ছেড়ে আসা ওই জরাজীর্ণ নৌকায় ছিলেন অসংখ্য অভিবাসনপ্রত্যাশী।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে এক মায়ের চোখের সামনে। ইউরোপের তীরে পৌঁছানোর ঠিক আগমুহূর্তে তীব্র ঠাণ্ডায় (হাইপোথারমিয়া) জমে গিয়ে মারা গেছে মাত্র এক বছর বয়সী দুই যমজ বোন। ওই নৌকায় থাকা আফ্রিকার দেশ গিনি থেকে আসা এক যাত্রী ও শিশু দুটির মায়ের জবানবন্দিতে এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের মধ্যে একজন পুরুষও তীরে নামার পরপরই হাইপোথারমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
নিখোঁজ নৌযান ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান
আইওএম-এর তথ্যানুসারে, ল্যাম্পেদুসায় পৌঁছানো নৌকাটির সঙ্গেই একই স্থান থেকে আরও একটি নৌকা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু সেই নৌকাটি গন্তব্যে পৌঁছায়নি এবং সাগরের বুকেই সেটি সলিল সমাধি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মাল্টা উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজের সহায়তায় উদ্ধার করা হয়েছে এক ব্যক্তিকে। ওই জীবিত যাত্রীর দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, তাদের নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর অন্তত ৫০ জন সহযাত্রী নিখোঁজ অথবা মারা গেছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত ১০ দিনে ঘটে যাওয়া একাধিক দুর্ঘটনায় সব মিলিয়ে কয়েক শ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে সাগর উত্তাল থাকায় এবং আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাচারচক্রের ফাঁদ ও আইওএম-এর হুঁশিয়ারি
নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে আইওএম তীব্র উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, এই ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করে যে ভূমধ্যসাগরকেন্দ্রীক মানবপাচারকারী চক্রগুলো কতটা সক্রিয় ও বেপরোয়া। মুনাফালোভী দালালরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভাঙাচোরা ও অনুপযুক্ত নৌকায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ বোঝাই করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সাগরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি রোধে এবং অপরাধী চক্রগুলোকে নির্মূল করতে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা ও অভিবাসীদের উৎস
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার উপকূল ব্যবহার করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতপীড়িত ও দরিদ্র অঞ্চল থেকে আসা মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু উত্তাল সাগরে প্রায়ই নৌকাডুবির ঘটনায় অনেকেরই সলিল সমাধি হচ্ছে, আর যারা বেঁচে ফিরছেন, তাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে স্বজন হারানোর দগদগে ক্ষত।
Analysis | Habibur Rahman