৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৩০শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৩০ শুক্রবার বসন্তকাল
যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) পাঠানো আইনি সমন ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি গৌতম আদানি ও তাঁর ভাইপো সাগর আদানির কাছে পৌঁছে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। ঘুষ ও প্রতারণার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা এই সমন গত বছর দুই দফায় ফেরত পাঠায় ভারতের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়। এই পরিস্থিতিতে প্রথাগত কূটনৈতিক প্রোটোকল ভেঙে এখন বিকল্প পথে, অর্থাৎ সরাসরি ইমেলের মাধ্যমে আদানিদের কাছে নোটিশ পাঠানোর অনুমতি চেয়েছে মার্কিন সংস্থাটি।

সম্প্রতি নিউইয়র্কের একটি আদালতের নথি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
দিল্লি বনাম ওয়াশিংটন: সমন ফেরানোর নেপথ্য কারণ
নিউইয়র্ক আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, আদানিদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ কার্যকর করতে হেগ কনভেনশন (আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার নিয়ম) মেনে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত সরকারের কাছে আবেদন করেছিল এসইসি। তবে তিন মাস অপেক্ষার পর মে মাসে ভারত সরকার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে কাগজপত্র ফেরত পাঠায়।
ভারতের কেন্দ্রীয় মোদি সরকারের পক্ষ থেকে অদ্ভুত এক প্রযুক্তিগত কারণ দর্শানো হয়। তাদের দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা নথিপত্রে ‘আসল’ বা ‘অরিজিনাল’ কোনো সিলমোহর নেই এবং এতে কলমের কালিতে করা কোনো স্বাক্ষরও অনুপস্থিত। ফলে এই সমনটি আসল কি না, তা নিয়ে ভারত সরকার নিশ্চিত হতে পারছে না।
এর পরপরই এসইসি আবারও প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠায়। কিন্তু গত ডিসেম্বরে ভারত সরকার দ্বিতীয়বারের মতো তা ফেরত দেয়। এবার যুক্তি দেখানো হয়, সমনটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া মেনে পাঠানো হয়নি। ফলে এটি আদানিদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা যুক্তি ও ইমেইল-কৌশল
ভারতের এই ব্যাখ্যাকে ‘ভুল’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছে এসইসি। মার্কিন সংস্থাটির আইনজীবীরা নিউইয়র্কের আদালতকে জানিয়েছেন, হেগ কনভেনশনের নিয়মাবলীতে কোথাও বলা নেই যে আইনি নথিতে ফিজিক্যাল সিলমোহর বা কালির স্বাক্ষর থাকতেই হবে। এসইসির অভিযোগ, ভারতের এই আপত্তি মূলত সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল এবং এর কোনো শক্ত আইনি ভিত্তি নেই।
এই অচলাবস্থা কাটাতে এসইসি এখন নিউইয়র্ক ফেডারেল আদালতের কাছে বিশেষ অনুমতির আবেদন জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাব, যেহেতু ভারত সরকার প্রচলিত পথে সহযোগিতা করছে না, তাই আন্তর্জাতিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি আদানি ও তাঁর ভাইপোর ইমেইল ঠিকানায় সমন পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হোক।
অভিযোগের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের নভেম্বরে আদানি গ্রুপের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলে মার্কিন প্রশাসন। অভিযোগে বলা হয়, আদানি গ্রিন এনার্জির উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি নিশ্চিত করতে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই ঘটনার জেরেই গৌতম আদানি ও সাগর আদানির বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা দায়ের করে এসইসি।
আদানি গ্রুপের বক্তব্য
পুরো বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছে আদানি গ্রুপ। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। আদানি গ্রিন এনার্জি শুক্রবার ভারতীয় শেয়ারবাজারকে জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ঘুষের কোনো সরাসরি অভিযোগ আনা হয়নি। এটি কেবল একটি দেওয়ানি (Civil) মামলা এবং তারা আইনি পথেই এর মোকাবিলা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আদানি ইস্যুতে ভারত সরকারের এই রক্ষণাত্মক অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনড় মনোভাব দুই দেশের আইনি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অস্বস্তির জন্ম দিতে পারে। এখন নিউইয়র্কের আদালত ইমেইলে সমন পাঠানোর অনুমতি দেয় কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
Analysis | Habibur Rahman